Logo

ইউএসএ নিউজ    >>   লালন দর্শনের আলোয় নিউইয়র্কে ‘সাধু মেলা’—‘মাটির গান’-এর ব্যতিক্রমী আয়োজনে বাউল সুর, মানবতার বাণী ও মননশীল সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা

লালন দর্শনের আলোয় নিউইয়র্কে ‘সাধু মেলা’—‘মাটির গান’-এর ব্যতিক্রমী আয়োজনে বাউল সুর, মানবতার বাণী ও মননশীল সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা

লালন দর্শনের আলোয় নিউইয়র্কে ‘সাধু মেলা’—‘মাটির গান’-এর ব্যতিক্রমী আয়োজনে বাউল সুর, মানবতার বাণী ও মননশীল সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা

প্রজ্ঞা নিউজ ডেস্ক :
বাংলার লোকঐতিহ্য, মানবতাবাদী দর্শন ও বাউল চেতনার অগ্রদূত লালন সাঁইয়ের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করে নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত হয়েছে ব্যতিক্রমধর্মী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ‘সাধু মেলা’। সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘মাটির গান’-এর আয়োজনে অনুষ্ঠিত এ অনুষ্ঠানটি ছিল সংগঠনটির আত্মপ্রকাশের পর প্রথম বড় সাংস্কৃতিক পরিবেশনা, যা প্রবাসী দর্শক-শ্রোতাদের হৃদয়ে গভীর অনুরণন সৃষ্টি করে।


গত ৭ জুন ২০২৬, রবিবার সন্ধ্যা ৬টায় জ্যাকসন হাইটসের নবান্ন রেস্টুরেন্টের পার্টি হলে অনুষ্ঠিত এ আয়োজন লালন দর্শন, বাউল সংগীত ও মানবতার চেতনায় এক অনন্য মিলনমেলায় পরিণত হয়। সাদা পোশাকে সজ্জিত শিল্পী ও দর্শকদের উপস্থিতি এবং নীলাভ আলোকসজ্জা পুরো পরিবেশকে লালনের ভাবধারায় এক অন্যরকম আবহে রাঙিয়ে তোলে।


জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। পরে যন্ত্রসংগীত শিল্পী দেবু চৌধুরী আলোক প্রজ্বালনের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। লালন সংগীত শিল্পী দীন আফরোজ রেবা অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী বক্তব্য প্রদান করেন। অডিও বার্তায় শুভেচ্ছা জানান কুষ্টিয়ার লালন আখড়ার অন্যতম খাদেম মোহাম্মদ আলী। অনুষ্ঠানে উপস্থিত অতিথি ও দর্শকদের স্বাগত জানান ‘মাটির গান’-এর প্রধান বাউল শিল্পী শাহীন হোসেন।


অনুষ্ঠানে শিল্পীরা সমবেত ও এককভাবে পরিবেশন করেন লালনের কালজয়ী গান— ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি’, ‘কে বানাইলো এমন রঙমহলখানা’, ‘বাড়ির কাছে আরশিনগর’, ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’, ‘সাঁই আমার কখন খেলে কোন খেলা’, ‘বিনা কার্যে ধন উপার্জন কে করিতে পারে’, ‘জাত গেল জাত গেল বলে’ এবং ‘অপার হয়ে বসে আছি’। দর্শক-শ্রোতারা মুগ্ধ হয়ে উপভোগ করেন প্রতিটি পরিবেশনা।


শাহীন হোসেনের নেতৃত্বে সংগীত পরিবেশন করেন করিম হাওলাদার, মেরিয়ান রোজারিও, মলি দাস, তুলি বিশ্বাস, মনিকা দাস, খালেদা পারভীন, তমালিকা নন্দিনী, কানিজ লুনা, খ্রিস্টেলা কুইয়া ও সুশীল সিনহা। যন্ত্রসংগীতে ছিলেন দেবু চৌধুরী, স্বপন দত্ত, শফিক, রঞ্জিত মণ্ডল, রুবেল, শহীদউদ্দিন ও শাহীন হোসেন। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন মাসুদ সুমন।


বক্তব্যে দেবু চৌধুরী বলেন, “লালন সাঁইয়ের প্রাসঙ্গিকতা সময়ের সঙ্গে আরও বেড়েছে। তাঁর দর্শন ও চিন্তাকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে আরও গবেষণা ও সৃজনশীল কাজের প্রয়োজন। ‘মাটির গান’ সেই উদ্যোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা করেছে।”
স্বাগত বক্তব্যে শাহীন হোসেন বলেন, “লালনকে দেখার জ্ঞানতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি আজ নতুনভাবে মূল্যায়িত হচ্ছে। তাঁর দর্শনকে বিশ্বমানের দার্শনিক আলোচনার পরিসরে উপস্থাপন করা সম্ভব। আমরা সেই প্রচেষ্টার অংশ হতে চাই।”


অনুষ্ঠানে লালনের ‘আমি, আত্মা ও পরম’, ‘দেহ, প্রকৃতি ও প্রেম’ এবং ‘ভাষা, ভাব ও উপলব্ধি’ বিষয়ক গানগুলো বিশেষ গুরুত্ব পায়। শিল্পীদের পরিবেশনায় লালনের দর্শনের গভীরতা, মানবমুক্তির আকাঙ্ক্ষা এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনা প্রাণবন্তভাবে ফুটে ওঠে।


বিশেষ করে শাহীন হোসেনের একক পরিবেশনাগুলো দর্শকদের প্রশংসা কুড়ায়। তাঁর কণ্ঠ, উপস্থাপনা ও লালন দর্শনের ব্যাখ্যায় সংগীত শিক্ষার গভীরতা ও শিল্পীসত্তার পরিপক্বতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অন্যান্য শিল্পীরাও সুর, ভাব ও পরিবেশনায় সমান দক্ষতার পরিচয় দেন।


প্রথম আয়োজনেই ‘মাটির গান’ প্রমাণ করেছে যে, প্রবাসের মাটিতেও বাংলা লোকসংস্কৃতি, বাউল ঐতিহ্য ও মানবতার দর্শনকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার একটি শক্তিশালী সাংস্কৃতিক প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠতে পারে। অনুষ্ঠান শেষে দর্শকদের মধ্যে ভবিষ্যতে আরও বৃহত্তর পরিসরে এ ধরনের আয়োজনের প্রত্যাশা দেখা যায়।


লালনের অসাম্প্রদায়িক মানবতার বাণী ও বাউল দর্শনের আলোয় আলোকিত এই ‘সাধু মেলা’ নিউইয়র্কের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এক স্মরণীয় সন্ধ্যার জন্ম দিয়েছে। ‘মাটির গান’-এর এই যাত্রা ভবিষ্যতে প্রবাসে বাংলা সংস্কৃতির আরও বিস্তৃত বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে—এমন আশাবাদ ব্যক্ত করেন উপস্থিত সংস্কৃতিপ্রেমীরা।