Logo

আন্তর্জাতিক    >>   শিখা অনির্বাণে আঁধার কেন? মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, জাতীয় চেতনা ও ইতিহাস রক্ষার প্রশ্নে রাষ্ট্রের স্বচ্ছতা জরুরি

শিখা অনির্বাণে আঁধার কেন? মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, জাতীয় চেতনা ও ইতিহাস রক্ষার প্রশ্নে রাষ্ট্রের স্বচ্ছতা জরুরি

শিখা অনির্বাণে আঁধার কেন? মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, জাতীয় চেতনা ও ইতিহাস রক্ষার প্রশ্নে রাষ্ট্রের স্বচ্ছতা জরুরি

নয়ন বিশ্বাস রকি:
ঢাকা সেনানিবাসের ঐতিহাসিক স্মৃতিস্তম্ভ ‘শিখা অনির্বাণ’ শুধু একটি স্থাপনা নয়, এটি বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের গৌরব, আত্মত্যাগ ও বীরত্বের এক অনন্য প্রতীক। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যসহ সকল শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার নিদর্শন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত এই শিখা দীর্ঘদিন ধরে জাতির আবেগ ও ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
কিন্তু সম্প্রতি শিখা অনির্বাণের নিরবচ্ছিন্ন প্রজ্বলন বন্ধ হওয়ার খবরে সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা প্রশ্ন ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। জানা গেছে, গত ২ মে থেকে এটি সরকারের নির্দেশে অবিরাম জ্বলছে না। আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতা ও বৈশ্বিক জ্বালানি পরিস্থিতির কারণে সরকারের গৃহীত মিতব্যয়িতা ও জ্বালানি সাশ্রয়ী পদক্ষেপের অংশ হিসেবে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সরকারের এই ব্যাখ্যা প্রশাসনিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনার দাবি রাখে। কিন্তু শিখা অনির্বাণের মতো একটি জাতীয় প্রতীকের ক্ষেত্রে বিষয়টি শুধু জ্বালানি সাশ্রয়ের হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি জাতির আত্মপরিচয়, আবেগ এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা।
একটি অনির্বাণ শিখা বিশ্বের বহু দেশে জাতীয় বীর ও শহীদদের স্মরণে ব্যবহার করা হয়। এর অর্থ হলো—যারা জাতির জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন, তাদের স্মৃতি কখনো নিভে যাবে না। বাংলাদেশেও শিখা অনির্বাণ সেই একই চেতনার ধারক।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ ছিল বাঙালি জাতির সবচেয়ে গৌরবময় অধ্যায়। ৩০ লাখ শহীদের আত্মত্যাগ, অসংখ্য মা-বোনের ত্যাগ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে স্বাধীন বাংলাদেশ। সেই ইতিহাসকে ধারণ ও সংরক্ষণ করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের পাশাপাশি প্রতিটি নাগরিকের।
দুঃখজনক হলেও সত্য, সাম্প্রতিক সময়ে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, স্বাধীনতার চেতনা এবং জাতীয় স্মৃতির প্রতীকগুলো নিয়ে নানা বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতি, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বিভিন্ন স্থাপনা ও ঐতিহাসিক নিদর্শন নিয়ে যে ধরনের আক্রমণ ও অবমাননার ঘটনা ঘটেছে, তা একটি স্বাধীন জাতির ইতিহাসচেতনার জন্য উদ্বেগজনক।
ইতিহাস কখনো ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে পরিবর্তিত হয় না। মুক্তিযুদ্ধ কোনো দলীয় সম্পদ নয়; এটি বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাস। যে কোনো সরকার বা রাজনৈতিক শক্তির ঊর্ধ্বে উঠে এই ইতিহাসের মর্যাদা রক্ষা করা রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব।
শিখা অনির্বাণ বন্ধ থাকার ঘটনাকে ঘিরে মানুষের মনে যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, তার উত্তর স্বচ্ছভাবে দেওয়া প্রয়োজন। যদি এটি শুধুমাত্র জ্বালানি সাশ্রয়ের কারণে হয়ে থাকে, তবে জনগণের কাছে বিষয়টি আরও পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা উচিত। কারণ জাতীয় প্রতীক নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আজকের তরুণ প্রজন্ম ১৯৭১ দেখেনি। তারা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানতে পারে বই, পরিবার, চলচ্চিত্র এবং স্মৃতিচিহ্নের মাধ্যমে। শিখা অনির্বাণ তাদের কাছে শুধু একটি শিখা নয়, এটি স্বাধীনতার মূল্য বোঝার একটি জীবন্ত পাঠ।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা শুধু স্মৃতিস্তম্ভে সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রকৃত অর্থ হলো—গণতন্ত্র, মানবিক মর্যাদা, অসাম্প্রদায়িকতা, ন্যায়বিচার ও দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা। তবে সেই চেতনাকে শক্তিশালী করতে হলে জাতীয় স্মৃতিচিহ্নগুলোর মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখতে হবে।
রাষ্ট্র চাইলে প্রযুক্তিগত পরিবর্তন, সংস্কার বা ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন করতে পারে। কিন্তু ইতিহাসের প্রতীক নিয়ে যেকোনো সিদ্ধান্ত হতে হবে সংবেদনশীল, যুক্তিনির্ভর ও স্বচ্ছ। প্রয়োজনে মুক্তিযোদ্ধা, ইতিহাসবিদ, গবেষক ও নাগরিক সমাজের মতামতও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।
একটি শিখা সাময়িকভাবে নিভে যেতে পারে, কিন্তু একটি জাতির ইতিহাস কখনো নিভে যায় না। তবে সেই ইতিহাসকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে প্রয়োজন শ্রদ্ধা, সচেতনতা ও দায়িত্বশীলতা।
শিখা অনির্বাণ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—স্বাধীনতা অর্জন করা যেমন কঠিন, তেমনি তা রক্ষা করা আরও কঠিন। তাই এই প্রতীক শুধু অতীতের স্মৃতি নয়, এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি অঙ্গীকার।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সেই আলো যেন কোনোদিন ম্লান না হয়—এই প্রত্যাশাই আজকের বাংলাদেশে সবচেয়ে জরুরি।
নয়ন বিশ্বাস রকি
সাবেক ছাত্রলীগ নেতা, সমাজসেবক ও মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের কর্মী ।