জ্যাকসন হাইটসের বাংলাদেশি রেস্টুরেন্টে স্বাস্থ্যবিধির ভয়াবহ অবনতি: পচা খাবার ও অনিয়মে প্রশ্নের মুখে প্রবাসীদের আস্থা
প্রজ্ঞা নিউজ ডেস্ক:
নিউইয়র্কের কুইন্সের জ্যাকসন হাইটসের ৭৩ স্ট্রিট দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী বাংলাদেশি ও দক্ষিণ এশীয় অভিবাসীদের কাছে শুধু একটি খাবারের ঠিকানা নয়, বরং প্রবাসজীবনের এক টুকরো বাংলাদেশ। সারাদিন থেকে গভীর রাত পর্যন্ত মুখর থাকে এই সড়ক। বাংলা, ভারতীয় ও দক্ষিণ এশীয় নানা স্বাদের খাবারের টানে শুধু নিউইয়র্ক নয়, নিউ জার্সি, কানেকটিকাট, পেনসিলভানিয়া, ম্যাসাচুসেটসসহ বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য থেকেও ভোজনরসিকরা ছুটে আসেন এখানে। কিন্তু দেশের স্বাদ খুঁজতে এসে অনেকেই এখন নিম্নমানের খাবার, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং দুর্ব্যবহারের শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে জ্যাকসন হাইটসের একাধিক বাংলাদেশি রেস্টুরেন্টকে ঘিরে স্বাস্থ্যবিধি লঙ্ঘন, বাসি ও পচা খাবার পরিবেশন, অপরিচ্ছন্ন রান্নাঘর এবং নিম্নমানের সেবার অভিযোগ উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। নিউইয়র্ক সিটি ডিপার্টমেন্ট অব হেলথ অ্যান্ড মেন্টাল হাইজিন (DOHMH)-এর ধারাবাহিক পরিদর্শনে একাধিক রেস্টুরেন্টে নোটিশ লাগিয়ে প্রতিষ্ঠানকে সাময়িকভাবে কার্যক্রমও বন্ধ রাখতে বাধ্য করা হয়েছে।
সম্প্রতি অপরিচ্ছন্ন ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের কারণে CHEF’S MAHAL Restaurant & Grill Mannan Restaurant-এর বিরুদ্ধে স্বাস্থ্য বিভাগ ব্যবস্থা গ্রহণ করে। গত ৭ জুলাই সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায় সুপরিচিত নবান্ন রেস্টুরেন্ট। এর মাত্র দুই দিন পরই পাশের প্রিমিয়াম রেস্টুরেন্টকে ঘিরে বাসি ও পচা খাবার পরিবেশনের গুরুতর অভিযোগ সামনে আসে। এতে জ্যাকসন হাইটসের বাংলাদেশি রেস্টুরেন্টগুলোর খাদ্যমান, স্বাস্থ্যবিধি এবং তদারকি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও নিয়মিত ক্রেতাদের অভিযোগ, এলাকার অনেক রেস্টুরেন্টের প্রবেশপথে দীর্ঘদিন ধরে “Grade Pending” নোটিশ ঝুলতে দেখা যায়। স্বাস্থ্য বিভাগের পরিদর্শনে সাধারণত যেসব অনিয়ম ধরা পড়ে তার মধ্যে রয়েছে অপরিচ্ছন্ন রান্নাঘর, নির্ধারিত তাপমাত্রায় খাবার সংরক্ষণ না করা, বাসি খাবার পরিবেশন, পুরোনো তেলের সঙ্গে নতুন তেল মিশিয়ে রান্না, নিম্নমানের বা পচা সবজি ব্যবহার, খাবারের শোকেস অপরিষ্কার রাখা,সময় ও তারিখ স্টিকার ব্যবহার না করা, কর্মীদের গ্লাভস ব্যবহার না করা, অপরিচ্ছন্ন বাথরুম এবং ইঁদুর-তেলাপোকার উপদ্রব।
অভিযোগ রয়েছে, স্বাস্থ্য বিভাগের অভিযানের পর কিছুদিন নিয়ম মেনে চললেও অনেক প্রতিষ্ঠান পরে আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়। ফলে ভোক্তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।
এমনই এক অভিযোগ করেছেন ফারহানা (ছদ্মনাম), যিনি পেশায় একজন হেলথ প্রফেশনাল। তিনি জানান, গত ৯ জুলাই সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে প্রিমিয়াম রেস্টুরেন্ট থেকে এক ট্রে বিফ তেহারি অর্ডার করেন। পরিবারের এক স্বজনের মৃত্যুর কারণে বাসায় শিশু ও বয়স্ক সদস্যরা না খেয়ে ছিলেন বলে তিনি কর্মচারীদের খাবারটি ভালোভাবে প্যাকেট করতে অনুরোধ করেন।
প্রায় ১৫ মিনিট অপেক্ষার পর তাকে জানানো হয় বিফ তেহারি নেই, পরিবর্তে বিফ বিরিয়ানি দেওয়া হবে। সময়ের অভাবে তিনি তাতে সম্মতি দেন। পরে খাবারের সঙ্গে সালাদ বা প্রয়োজনীয় উপকরণ না পেয়ে আবারও বলতে হয়। পুরো মূল্য পরিশোধের পর অনিচ্ছাসত্ত্বেও কিছু সালাদ দেওয়া হয়।
তিনি বলেন, খাবারের প্যাকেট হাতে নিয়েই বুঝতে পারেন সেটি ঠান্ডা। গরম করে দিতে এবং খাবারটি তাজা কি না নিশ্চিত করতে অনুরোধ করলেও কোনো সদুত্তর না দিয়ে কর্মচারীরা দ্রুত ৭০ ডলার নিয়ে তাকে বিদায় করে দেন।
প্রায় ২০ মিনিট পর গন্তব্যে পৌঁছে খাবারের প্যাকেট খোলার সঙ্গে সঙ্গেই তীব্র পচা গন্ধ বের হয়। ফারহানার ভাষ্য, ছয় বছরের একটি শিশু সামান্য খাবার মুখে দেওয়ার পরপরই দুইবার বমি করে। পরে পুরো খাবারই ফেলে দিতে হয় এবং বাধ্য হয়ে অন্য রেস্টুরেন্ট থেকে নতুন করে খাবার অর্ডার করতে হয়।
পরদিন সন্ধ্যায় তিনি বিষয়টি জানাতে একই রেস্টুরেন্টে গেলে উল্টো দুর্ব্যবহারের শিকার হন বলে অভিযোগ করেন। তার ভাষ্য, তিনি কোনো অর্থ ফেরত চাননি; শুধু জানতে চেয়েছিলেন কেন বারবার অনুরোধ করার পরও ঠান্ডা ও পচা খাবার দেওয়া হলো এবং সেই খাবার খেয়ে কোনো শিশুর ক্ষতি হলে তার দায়িত্ব কে নেবে।
তিনি অভিযোগ করেন, তার প্রশ্নের জবাব না দিয়ে তিনজন কর্মচারী একযোগে চিৎকার শুরু করেন, অভিযোগ অস্বীকার করেন এবং তাকে অপমানজনক মন্তব্য করেন। ঘটনাস্থলে উপস্থিত অন্য কয়েকজন ক্রেতাও রেস্টুরেন্টটির খাবারের মান, সেবা এবং কর্মচারীদের আচরণ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন।
পুরো ঘটনাটি এই প্রতিবেদকের উপস্থিতিতেই ঘটে। পরে এ বিষয়ে রেস্টুরেন্টের শিফট ইনচার্জের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে রেস্টুরেন্টের ভেতরে ও বাইরে উপস্থিত একাধিক ব্যক্তি অভিযোগ করেন, সাম্প্রতিক সময়ে সেখানে বাসি ও নিম্নমানের খাবার পরিবেশনের ঘটনা বেড়েছে। অনেকেই জানান, কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করেও কোনো কার্যকর প্রতিকার পাননি।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্ধারিত তাপমাত্রায় খাবার সংরক্ষণ না করলে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া দ্রুত বৃদ্ধি পায়, যা ফুড পয়জনিং, বমি, ডায়রিয়া, জ্বরসহ গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হতে পারে। শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, গর্ভবতী নারী এবং দুর্বল রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষের জন্য এ ধরনের খাবার আরও বেশি বিপজ্জনক।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও কমিউনিটি নেতাদের আশঙ্কা, কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের অব্যবস্থাপনা ও দায়িত্বহীনতার কারণে জ্যাকসন হাইটসের পুরো বাংলাদেশি রেস্টুরেন্ট শিল্পের দীর্ঘদিনের সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তারা স্বাস্থ্য বিভাগের আরও কঠোর নজরদারি, নিয়মিত পরিদর্শন, ভোক্তাদের অভিযোগের দ্রুত তদন্ত এবং স্বাস্থ্যবিধি লঙ্ঘনকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, এখনই কঠোর পদক্ষেপ না নিলে শুধু কয়েকটি রেস্টুরেন্ট নয়, জ্যাকসন হাইটসের বাংলাদেশি খাদ্য ব্যবসার উপরই ভোক্তাদের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এদিকে, জ্যাকসন হাইটসের একাধিক বাংলাদেশি রেস্টুরেন্টের নিয়মিত ক্রেতাদের অভিযোগ, শুধু খাবারের মান নয়, দিন দিন সেবার মানও আশঙ্কাজনকভাবে নিম্নমুখী হচ্ছে। তাদের ভাষ্য, খাবার পরিবেশনের পর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কর্মীদের আর টেবিলে ফিরে এসে খাবারের মান বা অতিরিক্ত কোনো প্রয়োজন আছে কি না তা জানতে দেখা যায় না। অনেক সময় বারবার ডাকাডাকি করেও কর্মীদের সাড়া পাওয়া যায় না। অভিযোগ রয়েছে, অনেক কর্মী ক্রেতাদের সেবার পরিবর্তে নিজেদের মধ্যে গল্প করা বা মোবাইল ফোন ব্যবহারে ব্যস্ত থাকেন।
ক্রেতাদের আরও অভিযোগ, অনেক রেস্টুরেন্টে খাবারের মূল্যের সঙ্গে প্রযোজ্য বিক্রয় কর (Sales Tax) যোগ করার পাশাপাশি ১৫ শতাংশ পর্যন্ত সার্ভিস চার্জও বিলের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। অথচ সেই অতিরিক্ত সার্ভিস চার্জের বিপরীতে প্রত্যাশিত মানের সেবা পান না বলে অনেকের অভিযোগ। তাদের মতে, সেবার মান ও গ্রাহকসেবার সংস্কৃতি উন্নত না হলে অতিরিক্ত সার্ভিস চার্জ আরোপ ভোক্তাদের মধ্যে অসন্তোষ আরও বাড়াবে।
এছাড়া কয়েকজন নিয়মিত ক্রেতা অভিযোগ করেন, কিছু রেস্টুরেন্টে শুধু এক কাপ চা, নাশতা বা হালকা খাবার নিয়ে বসার সুযোগও সীমিত করে দেওয়া হয়। অনেক সময় টেবিলে ‘Reserved’ লেখা সাইন রেখে অথবা ‘Take Out Only’ নোটিশ টাঙিয়ে ক্রেতাদের বসতে নিরুৎসাহিত করা হয়। ফলে অনেকেই বাধ্য হয়ে খাবার নিয়ে বাইরে চলে যান। তাদের অভিযোগ, রেস্টুরেন্টগুলো ব্যবসায়িক স্বার্থে দ্রুত টেবিল খালি রাখার চেষ্টা করলেও গ্রাহকসেবার মানোন্নয়নে সমান গুরুত্ব দিচ্ছে না।
স্থানীয় কমিউনিটির বিশিষ্টজনদের মতে, জ্যাকসন হাইটসের বাংলাদেশি রেস্টুরেন্টগুলো শুধু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নয়, এগুলো প্রবাসে বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও আতিথেয়তারও প্রতিনিধিত্ব করে। তাই খাবারের মান, স্বাস্থ্যবিধি, গ্রাহকসেবা এবং পেশাদার আচরণ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। অন্যথায় কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের অব্যবস্থাপনার কারণে পুরো বাংলাদেশি রেস্টুরেন্ট শিল্পের দীর্ঘদিনের অর্জিত সুনাম ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।



















