Logo

ইউএসএ নিউজ    >>   বাংলা ভাষা ও সাহিত্যচর্চার মিলনমেলায় প্রাণের উচ্ছ্বাস: ওয়াশিংটনে দুইদিনব্যাপী ডিসি বইমেলা সম্পন্ন; উদ্বোধনে তসলিমা নাসরিনের ঘোষণা— বাংলা ভাষাই আমার প্রকৃত দেশ

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যচর্চার মিলনমেলায় প্রাণের উচ্ছ্বাস: ওয়াশিংটনে দুইদিনব্যাপী ডিসি বইমেলা সম্পন্ন; উদ্বোধনে তসলিমা নাসরিনের ঘোষণা— বাংলা ভাষাই আমার প্রকৃত দেশ

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যচর্চার মিলনমেলায় প্রাণের উচ্ছ্বাস: ওয়াশিংটনে দুইদিনব্যাপী ডিসি বইমেলা সম্পন্ন; উদ্বোধনে তসলিমা নাসরিনের ঘোষণা— বাংলা ভাষাই আমার প্রকৃত দেশ

প্রজ্ঞা নিউজ ডেস্ক:
প্রবাসে বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিকাশে আরেকটি উজ্জ্বল অধ্যায়ের সাক্ষী হলো যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসি। সাহিত্যপ্রেমী, লেখক, শিল্পী, পাঠক ও সংস্কৃতিকর্মীদের প্রাণবন্ত অংশগ্রহণে গত ২৬ ও ২৭ জুন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল দুইদিনব্যাপী ডিসি বইমেলা ২০২৬। ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংগঠন বাংলা কেন্দ্র আয়োজিত এই বইমেলা অনুষ্ঠিত হয় মেরিল্যান্ডের রিভার রোড ইউনিটারিয়ান ইউনিভার্সালিস্ট কংগ্রেগেশনাল চার্চে।
মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশে কুড়েঘরসদৃশ নান্দনিক স্থাপনাকে ঘিরে বই, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও বাঙালিয়ানার এক অনন্য আবহ তৈরি হয়। বইপ্রেমীদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে পুরো মেলা প্রাঙ্গণ।


দুইদিনব্যাপী এই বইমেলার উদ্বোধন করেন স্বনামধন্য কথাসাহিত্যিক, কবি ও মানবাধিকারকর্মী ডা. তসলিমা নাসরিন। ফিতা কেটে ও প্রদীপ প্রজ্বালনের মাধ্যমে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে মেলার শুভ সূচনা করেন। এ সময় তাঁর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন প্রধান অতিথি একুশে পদকপ্রাপ্ত লেখক, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বঙ্গবন্ধু বইমেলা-একাত্তরের প্রহরী ফাউন্ডেশনের সভাপতি ড. নুরুন নবী, সব্যসাচী শিল্পী ও বীর মুক্তিযোদ্ধা তাজুল ইমাম, বইমেলার অন্যতম আয়োজক সাংবাদিক দস্তগীর জাহাঙ্গীরসহ আয়োজক, অতিথি ও বিশিষ্টজন।
উদ্বোধনী বক্তব্যে দীর্ঘ ৩১ বছরের নির্বাসিত জীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে আবেগঘন কণ্ঠে তসলিমা নাসরিন বলেন,
“আমার জীবনে রাষ্ট্র বদলেছে, ভূগোল বদলেছে, ঠিকানা বদলেছে। কিন্তু যেখানেই থাকি, বাংলা ভাষাই আমার একমাত্র আশ্রয়, আমার একমাত্র দেশ। রাষ্ট্র মানুষকে নির্বাসিত করতে পারলেও ভাষা থেকে বিচ্যুত করতে পারে না।”


তিনি আরও বলেন, “আমি বাংলাতেই ভাবি, বাংলাতেই স্বপ্ন দেখি এবং বাংলাতেই প্রতিবাদ করি। ইউরোপে এক দশক থাকার পর ভাষার টানেই আমি পশ্চিমবঙ্গে গিয়েছিলাম, কিন্তু সেখানেও আমাকে থাকতে দেওয়া হয়নি। তবুও আমার লড়াই থেমে নেই। আমি লিখে চলেছি মৌলবাদ, ধর্মান্ধতা, নারীর অধিকার ও বাকস্বাধীনতার পক্ষে। কারণ লেখাই আমার শ্বাস নেওয়া, লেখাই আমার বেঁচে থাকা।”
প্রযুক্তিনির্ভর বর্তমান সময়ে বই পড়ার অভ্যাস কমে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন,
“আজ মোবাইলের স্ক্রিন বইয়ের পাতা কেড়ে নিচ্ছে। মানুষ গভীর পাঠ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। এই সময়ে প্রবাসে বইমেলার আয়োজন এক ধরনের সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ। এটি শেকড় হারানোর বিরুদ্ধে এবং ভাষাহীন হয়ে যাওয়ার বিরুদ্ধে এক বলিষ্ঠ লড়াই।”
নতুন প্রজন্মের উদ্দেশে তিনি বলেন,
“আমাদের সন্তানরা যদি বাংলা পড়তে না শেখে, তবে তারা শুধু একটি ভাষা হারাবে না; তারা হারাবে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দের মতো বিশাল এক মানবিক উত্তরাধিকারকে। ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, ভাষা মানুষের আত্মপরিচয় তৈরি করে।”


বইমেলার গুরুত্ব তুলে ধরে তসলিমা নাসরিন বলেন, “বই মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখায়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে শেখায়। যে সমাজ বই পড়ে না, সেই সমাজ দ্রুত গুজব, কুসংস্কার ও স্বৈরাচারের হাতে বন্দি হয়ে যায়। তাই বইমেলা আসলে সভ্যতার মেলা।”
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ড. নুরুন নবী বলেন, প্রবাসে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে টিকিয়ে রাখতে বইমেলার মতো উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভাষা ও ইতিহাসকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে এ ধরনের আয়োজন আরও বিস্তৃত হওয়া প্রয়োজন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ফোবানা কেন্দ্রীয় কমিটির চেয়ারম্যান জাকারিয়া চৌধুরী, সাংবাদিক নঈম নিজাম, নাট্যজন লুৎফুন নাহার লতা, ফটোগ্রাফার ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মিনহাজ আহমেদ সাম্মু, অ্যাকটিভিস্ট গোপাল সান্যাল, সাংবাদিক পিনাকী তালুকদার, কবি ফকির ইলিয়াস, কবি ফারহানা ইলিয়াস তুলি, ছড়াকার খালেদ শরফুদ্দীন, কবি মিশুক সেলিম, লেখক আবু সাঈদ রতন, রোকসানা ইয়াসমিন, শিশু সাহিত্যিক হুমায়ুন কবীর ঢালি, আসলাম আহমাদ খান, সামিনা আমিন, লেখক ও সাংবাদিক আনিস আহমেদ, উপস্থাপক ও লেখক মৃদুল আহমেদ, শিল্পী মনি দিনার, নাসরিনা আহমেদ মুন্না, ইরাজ তালুকদারসহ বিপুলসংখ্যক লেখক, পাঠক, শিল্পী, সংগঠক ও সুধীজন।


প্রথম দিনের অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন মৃদুল আহমেদ ও সোনিয়া শারমিন সিরাজ। অনুষ্ঠানের সূচনা হয় সূত্রধর ডান্স একাডেমির শিল্পীদের কুচিপুড়ি নৃত্য পরিবেশনার মাধ্যমে। এরপর মেরিল্যান্ড বাংলা স্কুল-এর শিক্ষার্থীরা পরিবেশন করেন সমবেত সংগীত।
লেখক আবু সাঈদ রতন-এর সঞ্চালনায় শিশু-কিশোরদের অংশগ্রহণে বিশেষ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে অংশ নেন জাহিদ আহসান রাসেল, নজরুল ইসলাম বাবু, জাকারিয়া চৌধুরী এবং বইমেলার পৃষ্ঠপোষক নুরুল আমিন বাবু।
দুইদিনই বইয়ের স্টলগুলোতে ছিল ব্যাপক ভিড় এবং সন্তোষজনক বই বিক্রি। প্রবাসের মেরিল্যান্ড, ভার্জিনিয়া, ওয়াশিংটন ডিসিসহ বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য থেকে আগত বইপ্রেমীরা বই কেনা, লেখক-পাঠক আড্ডা এবং সাংস্কৃতিক আয়োজনে অংশ নেন। চলচ্চিত্র অভিনেত্রী মৌসুমীসহ শোবিজ অঙ্গনের কয়েকজন পরিচিত মুখও মেলায় উপস্থিত ছিলেন।


দ্বিতীয় দিনের সূচনা হয় প্রাতরাশ-সাহিত্য আড্ডার মধ্য দিয়ে। এদিন বাংলা কেন্দ্র-এর পক্ষ থেকে সাহিত্যিক ও অ্যাকটিভিস্ট নূরজাহান বোসকে আজীবন সম্মাননা প্রদান করা হয়। তাঁর হাতে সম্মাননা স্মারক ও ক্রেস্ট তুলে দেন ড. নুরুন নবী ও ডা. তসলিমা নাসরিন। শিল্পী সিলভিয়া পান্ডিত তসলিমা নাসরিনকে তাঁর নিজের আঁকা একটি প্রতিকৃতি উপহার দেন।
পরে সাহিত্য আলোচনা, সাক্ষাৎকার ও চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর পাশাপাশি সঙ্গীত পরিবেশন করেন শাহ মাহবুব, বিন্দু কনা, রেশমী মির্জা ও স্বপ্নীল সজীব।
বীর মুক্তিযোদ্ধা তাজুল ইমাম পরিবেশন করেন অবিনাশী সুরধারা শীর্ষক দেশাত্মবোধক সংগীত; তবলায় সঙ্গত করেন পিনুসেন দাস। গান ও কবিতার যুগল পরিবেশনায় দর্শকদের মুগ্ধ করেন দিনার মনি ও গোপন সাহা। নাট্যশিল্পী মিজানুর রহমান খান পরিবেশন করেন নূরুলদীনের সারাজীবন নাটক থেকে আবৃত্তি ও অভিনয়।


অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল নাট্যজন লুৎফুন নাহার লতার একক পরিবেশনা আমি বীরাঙ্গনা বলছি। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক এই আবেগঘন উপস্থাপনা দর্শকদের ইতিহাসের গভীর বেদনা, সাহস ও আত্মত্যাগের স্মৃতির সঙ্গে নতুনভাবে সংযুক্ত করে।
পুরো দুইদিনের আয়োজনজুড়ে বই, সাহিত্য, ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, সংগীত, নাটক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনা এক অনন্য মিলনমেলায় রূপ নেয়। আয়োজকদের ভাষ্য, প্রবাসে নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে পৌঁছে দেওয়াই ডিসি বইমেলার মূল লক্ষ্য। সেই লক্ষ্য পূরণে এবারের আয়োজন ছিল অত্যন্ত সফল ও স্মরণীয়। 
সূত্র: বাঙালী , আসলাম আহমাদ খান, গোপাল সান‍্যাল ।