রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ: সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় এখন কী হবে?
সজিব কুমার চয়ন:
দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে আকস্মিক শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন সম্প্রতি স্পিকার হাফিজ উদ্দিনের কাছে তাঁর পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন। এ ঘটনার পর স্বাভাবিকভাবেই জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—এখন কী হবে, কে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন এবং নতুন রাষ্ট্রপতি কীভাবে নির্বাচিত হবেন? বাংলাদেশের সংবিধান এ বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছে।
মেয়াদ শেষের আগেই বিদায়?
সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির মেয়াদ পাঁচ বছর এবং একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ দুই মেয়াদে এ পদে অধিষ্ঠিত থাকতে পারেন। ২০২৩ সালের এপ্রিলে দায়িত্ব গ্রহণকারী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের মেয়াদ ২০২৮ সাল পর্যন্ত থাকার কথা ছিল। তবে তিনি নির্ধারিত সময়ের আগেই স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছেন।
বাংলাদেশের সংবিধানে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার তিনটি কারণ উল্লেখ রয়েছে—মেয়াদ পূর্ণ হওয়া, স্বেচ্ছায় পদত্যাগ এবং অভিশংসন বা অপসারণ। বর্তমান পরিস্থিতিতে দ্বিতীয় কারণটি কার্যকর হয়েছে।
রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে দায়িত্ব পালন করবেন কে?
অনেকের ধারণা, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের ফলে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে শূন্যতা তৈরি হয়। বাস্তবে সংবিধান এ বিষয়ে স্পষ্ট ব্যবস্থা রেখেছে।
সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে অথবা তিনি অসুস্থতা বা অন্য কোনো কারণে দায়িত্ব পালনে অক্ষম হলে জাতীয় সংসদের স্পিকার সাময়িকভাবে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন। নতুন রাষ্ট্রপতি শপথ গ্রহণ না করা পর্যন্ত এই ব্যবস্থা বহাল থাকবে। ফলে রাষ্ট্র পরিচালনায় কোনো সাংবিধানিক সংকট বা নেতৃত্বহীনতার আশঙ্কা থাকে না।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দেন কারা?
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি প্রচলিত ভুল ধারণা রয়েছে। অনেকে মনে করেন, এ নির্বাচনে দেশের সাধারণ ভোটাররা অংশ নেন। বাস্তবে বিষয়টি তা নয়।
সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন জাতীয় সংসদের সদস্যদের ভোটে। অর্থাৎ এটি একটি পরোক্ষ নির্বাচন।
রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হতে হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ন্যূনতম ৩৫ বছর বয়স হতে হবে এবং তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য হতে হবে। মনোনয়নপত্রে একজন সংসদ সদস্যকে প্রস্তাবক এবং আরেকজনকে সমর্থক হিসেবে স্বাক্ষর করতে হয়। যদি একজন বৈধ প্রার্থী থাকেন, তবে ভোটগ্রহণের প্রয়োজন হয় না; তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। আর একাধিক বৈধ প্রার্থী থাকলে সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।
নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কবে হবে?
সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতির মৃত্যু, পদত্যাগ বা অপসারণের কারণে পদ শূন্য হলে পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে।
এই নির্বাচনী প্রক্রিয়া পরিচালনা করবেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার। সংসদের অধিবেশন চলমান থাকলে সংসদেই ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। প্রয়োজন হলে বিশেষ অধিবেশন আহ্বান করেও নির্বাচন সম্পন্ন করা যেতে পারে।
সবশেষে বলা যায়, রাষ্ট্রপতির আকস্মিক পদত্যাগ নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ঘটনা। তবে বাংলাদেশের সংবিধান এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য সুস্পষ্ট ও কার্যকর বিধান রেখেছে। ফলে স্পিকারের অন্তর্বর্তীকালীন দায়িত্ব পালন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন এবং সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা—সবকিছুই সংবিধান নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসারেই সম্পন্ন হবে। এ কারণে রাষ্ট্র পরিচালনায় কোনো সাংবিধানিক শূন্যতা বা অচলাবস্থার সৃষ্টি হওয়ার সুযোগ নেই।
সজিব কুমার চয়ন
আইন বিষয়ক বিশ্লেষক
শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ
বাংলাদেশ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়



















