সমুদ্রের গর্জন, জোছনার স্নিগ্ধ আলো আর সংস্কৃতির মিলনমেলা: নিউইয়র্কের রকওয়ে বিচে তৃতীয় ‘জোছনা উৎসব’ মাতালেন হাজারো প্রবাসী; আগামী বছর কার্নিভালের ঘোষণা
প্রজ্ঞা নিউজ ডেস্ক :
জোছনার স্নিগ্ধ আলো, আটলান্টিক মহাসাগরের অবিরাম গর্জন, শীতল সমুদ্রবাতাস আর বাঙালির প্রাণের সংস্কৃতির অপূর্ব সমন্বয়ে এক অনন্য মিলনমেলায় পরিণত হয়েছিল নিউইয়র্কের রকওয়ে বিচ। ‘জোছনা উৎসব’—শুধু একটি সাংস্কৃতিক আয়োজন নয়, বরং প্রবাসে বাঙালির শেকড়, স্মৃতি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং শিল্প-সাহিত্যের প্রতি ভালোবাসার এক অনন্য প্রকাশ।
গত ৩১ জুলাই (শুক্রবার) কুইন্সের আটলান্টিক মহাসাগর তীরবর্তী রকওয়ে বিচে তৃতীয়বারের মতো অনুষ্ঠিত এই ব্যতিক্রমী উৎসবে অংশ নেন হাজারো প্রবাসী বাঙালি। জোছনার রূপালি আলোয় গান, নৃত্য, কবিতা, আবৃত্তি, বাউল সংগীত, আড্ডা, ঘুড়ি উড়ানো আর সমুদ্রের গর্জনে মুখর হয়ে ওঠে পুরো সৈকত। উপস্থিত দর্শক-শ্রোতাদের কাছে উৎসবটি হয়ে ওঠে এক অনাবিল প্রশান্তি ও আনন্দের অবিস্মরণীয় সন্ধ্যা।
একঝাঁক প্রগতিশীল, অসাম্প্রদায়িক ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী সংগঠকের উদ্যোগে আয়োজিত এ উৎসবের উদ্বোধন করেন একুশে পদকপ্রাপ্ত বরেণ্য ব্যক্তিত্ব, বীর মুক্তিযোদ্ধা, লেখক, বিজ্ঞানী ও মূলধারার রাজনীতিবিদ ড. নুরুন নবী। প্রদীপ প্রজ্বলনের মধ্য দিয়ে উৎসবের শুভসূচনা হয়।
সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব গোপাল সান্যালের সঞ্চালনায় উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আয়োজক কমিটির পক্ষে বক্তব্য রাখেন বিশিষ্ট সাংবাদিক মুহাম্মদ ফজলুল রহমান, নুরুল আমিন বাবু, জাকারিয়া চৌধুরী, স্বীকৃতি বড়ুয়া, সাংবাদিক জাহাঙ্গীর দস্তগীর, আসলাম আহমেদ খান, সাংবাদিক পিনাকী তালুকদার, রামদাস ঘরামীসহ আরও অনেকে।
সমাপনী বক্তব্যে গোপাল সান্যাল জানান, আগামী বছর আরও বৃহত্তর পরিসরে আন্তর্জাতিক মানের কার্নিভাল আয়োজনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যা প্রবাসী বাঙালিদের জন্য নতুন এক সাংস্কৃতিক দিগন্ত উন্মোচন করবে।
অনুষ্ঠান শেষে প্রজ্ঞা নিউজকে অনেক দর্শক-শ্রোতা বলেন, এবারের জোছনা উৎসব আগের দুটি আয়োজনকে সবদিক থেকেই ছাড়িয়ে গেছে। তাঁদের ভাষায়, ‘এত সুন্দর একটি অনুষ্ঠান আরও দীর্ঘ সময় চললে ভালো হতো। মনে হচ্ছিল, মুহূর্তেই শেষ হয়ে গেল।’
যদিও রাত সাড়ে নয়টায় আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়, তবু গভীর রাত পর্যন্ত সৈকতজুড়ে চলতে থাকে গান, আড্ডা, ঘুড়ি উড়ানো, খাওয়া-দাওয়া এবং উৎসবের প্রাণবন্ত আমেজ।
এবারের উৎসবের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিলেন জনপ্রিয় চিত্রনায়িকা মৌসুমী ও অভিনেতা সাজু খাদেম। সংগীত পরিবেশন করেন স্বনামধন্য শিল্পী দিনাত জাহান মুন্নী, বাউল শিল্পী শাহীন হোসেন ও তাঁর দল, রেশমী মির্জা, বিন্দু কণা, বাউল বেলাল করীম, করিম হাওলাদার, আলভান চৌধুরী, সাগ্নিক মজুমদার, জেরিন মাইশাসহ আরও অনেক শিল্পী।
নৃত্য পরিবেশন করে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পারফর্মিং আর্টস (বিপা), নৃত্যাঞ্জলি এবং মৃথান ড্যান্স একাডেমির শিল্পীরা। পাশাপাশি ছিল আবৃত্তি, গীতিকাব্য, বাউল গানের আসর এবং নানা সৃজনশীল সাংস্কৃতিক পরিবেশনা।
অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেন তাহরিনা পারভীন প্রীতি ও স্বাধীন মজুমদার। গণযোগাযোগ ও মিডিয়া সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করেন সাংস্কৃতিক কর্মী আসলাম আহমেদ খান।
প্রবাসের ব্যস্ত জীবনে প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও মানুষের হৃদয়ের বন্ধনকে নতুনভাবে জাগিয়ে তোলা এই ‘জোছনা উৎসব’ আবারও প্রমাণ করেছে—বাংলার সংস্কৃতির শিকড় যত দূরেই ছড়িয়ে থাকুক, তার আলো কখনো ম্লান হয় না। রকওয়ে বিচের রূপালি জোছনায় সেই আলোরই আরেকটি উজ্জ্বল অধ্যায় রচিত হলো নিউইয়র্কে।



















