সাউথ এশিয়ান ইউনিটি প্যারেডে ঐক্যের স্লোগান, মাঠে প্রাণহীন আয়োজন!—অতিথি অনুপস্থিত, জনসমাগম হতাশাজনক, সাংস্কৃতিক সংগঠনের অংশগ্রহণ নেই—আয়োজনের উদ্দেশ্য ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে জ্যাকসন হাইটসে নানা প্রশ্ন
প্রজ্ঞা নিউজ ডেস্ক :
দক্ষিণ এশিয়ার ঐক্য, সংস্কৃতি, সম্প্রীতি ও বৈচিত্র্যের বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার প্রত্যয় নিয়ে নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটসে অনুষ্ঠিত হলো প্রথম সাউথ এশিয়ান ইউনিটি প্যারেড। ব্যাপক প্রচারণা, দীর্ঘ অতিথি তালিকা, বিশাল কমিটি এবং নানা পদ-পদবিতে সাজানো আয়োজন ঘিরে প্রত্যাশা তৈরি হলেও বাস্তবে প্যারেডে দেখা গেল ভিন্ন চিত্র। প্রত্যাশিত জনসমাগম হয়নি, দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের উল্লেখযোগ্য সাংস্কৃতিক সংগঠনের অংশগ্রহণ ছিল না, আমন্ত্রিত গুরুত্বপূর্ণ অতিথিদের বড় একটি অংশ উপস্থিত হননি এবং পুরো আয়োজনেই প্রাণবন্ততার ঘাটতি ছিল বলে মন্তব্য করেছেন প্যারেডে উপস্থিত অনেকেই।
গতকাল ৯ আগস্ট ২০২৬ রবিবার জ্যাকসন হাইটসের ৩৭ অ্যাভিনিউয়ের ৬৯ স্ট্রিট থেকে প্যারেড শুরু হয়ে ৮৭ স্ট্রিটে গিয়ে শেষ হয়। আয়োজকদের ঘোষণায় সকাল ১০টায় প্যারেড শুরু হওয়ার কথা থাকলেও অতিথিদের অপেক্ষায় প্রায় দুপুর ১২টার দিকে কার্যক্রম শুরু হয়। দুপুর ৩টা পর্যন্ত কর্মসূচি চলার কথা থাকলেও প্রায় ১টা ৩০ মিনিটের মধ্যেই প্যারেড শেষ হয়ে যায়।
নিউইয়র্ক সিটির মেয়র জোরান মামদানিকে প্রধান অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। কুইন্স বরো প্রেসিডেন্ট ডোনাভান রিচার্ডস এবং কুইন্স ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নি মেলিন্ডা কাটজকে সম্মানিত অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়। কিন্তু তিনজনের কেউই অনুষ্ঠানে উপস্থিত হননি। ফলে প্রচারসামগ্রীতে ঘোষিত অতিথি তালিকার সঙ্গে অনুষ্ঠানের বাস্তব উপস্থিতির বড় ধরনের পার্থক্য চোখে পড়ে।
প্যারেডের প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন মোহাম্মদ কাদের, সিআইপি এবং গ্র্যান্ড মার্শাল ছিলেন শাহ নেওয়াজ, এমবিএ, সিআইপি। সাংস্কৃতিক বিষয়ক চেয়ারপার্সনের দায়িত্বে ছিলেন রানো আমেনা নেওয়াজ। আহ্বায়ক মহিউদ্দিন দেওয়ান, প্রধান সমন্বয়কারী শাহ শহিদুল হক এবং সদস্য সচিব মোহাম্মদ আলম নমীসহ আয়োজক কমিটিতে ছিলেন বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তা ও সংগঠক।
প্রচারসামগ্রীতে জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী রানো আমেনা নওয়াজ এবং চলচ্চিত্র অভিনেত্রী শিরিন শিলা ও সাফা কবিরের নাম বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল। কিন্তু প্যারেডের মাঠপর্যায়ে ঘোষিত সেই জৌলুশের প্রতিফলন খুব একটা দেখা যায়নি বলে উপস্থিত অনেকেই মন্তব্য করেন।
সাউথ এশিয়ান ইউনিটি প্যারেডের মূল বক্তব্য ছিল দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও বৈচিত্র্যকে এক মঞ্চে তুলে ধরা। কিন্তু প্যারেডে উল্লেখযোগ্য কোনো সাংস্কৃতিক সংগঠনের ব্যাপক অংশগ্রহণ দেখা যায়নি। ফলে দক্ষিণ এশিয়ার সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্ব কতটা হয়েছে—এ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
প্যারেডে অংশ নেওয়া ব্যানারগুলোর দিকে তাকালে জনসম্পৃক্ততার চিত্র আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে বলে প্রত্যক্ষদর্শীদের মন্তব্য। প্রায় ১০ থেকে ১৫টি ব্যানার চোখে পড়লেও অনেক ব্যানারের সঙ্গে ৫-৬ জনের বেশি মানুষকে দেখা যায়নি। জ্যাকসন হাইটসের মতো ঘনবসতিপূর্ণ ও বৃহৎ দক্ষিণ এশীয় কমিউনিটির এলাকায় আয়োজিত একটি ইউনিটি প্যারেডে এমন সীমিত উপস্থিতি অনেকের কাছেই হতাশাজনক বলে মনে হয়েছে।
বিশেষ করে বাংলাদেশিদের ব্যাপক অংশগ্রহণ প্রত্যাশা করা হলেও প্যারেডে সেই চিত্র দেখা যায়নি। জ্যাকসন হাইটসের বাংলাদেশি কমিউনিটির আকার ও সাংগঠনিক শক্তির তুলনায় উপস্থিতি ছিল খুবই কম—এমন মন্তব্য করেছেন কয়েকজন অংশগ্রহণকারী।
অনুষ্ঠান শেষে প্যারেডে অংশ নেওয়া ও উপস্থিত ব্যক্তিদের মধ্যে নানা ধরনের ক্ষোভ, হতাশা ও প্রশ্নের কথা শোনা যায়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন অংশগ্রহণকারী বলেন, প্যারেডে কোনো শৃঙ্খলা ছিল না, ছিল না আয়োজকদের মধ্যে প্রত্যাশিত আন্তরিকতা। বাংলাদেশিদেরও বড় ধরনের অংশগ্রহণ দেখা যায়নি। তার অভিযোগ, আমাদের প্রতিষ্ঠানের ব্যানার দেওয়ার কথা বলা হলেও শেষ পর্যন্ত ব্যানার দেওয়া হয়নি। এমনকি অনুষ্ঠানকে সহযোগিতার জন্য স্বর্ণের চেইন ডোনেশন দিয়েও তিনি হতাশ হয়েছেন বলে জানান।
প্যারেডের সঙ্গে যুক্ত একজন আইনজীবীও ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, তাকে প্রচারপত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদ দেওয়া হলেও অনুষ্ঠানে একবারও বক্তব্য দেওয়ার জন্য ডাকা হয়নি। এমনকি তার নামও যথাযথভাবে ঘোষণা করা হয়নি বলে তিনি অভিযোগ করেন।
তার ভাষায়, পোস্টারে বিশাল পদ দিয়ে রাখা হলো, অথচ অনুষ্ঠানে আমাকে একবারও ডাকল না, কিছু বলার সুযোগও দিল না—এমনকি আমার নামটিও একবার প্রকাশ করা হলো না।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত কয়েকজনের মন্তব্য, পুরো প্যারেডে যে প্রাণচাঞ্চল্য, সাংস্কৃতিক আবহ ও জনসম্পৃক্ততা থাকার কথা ছিল, তার অনেকটাই অনুপস্থিত ছিল।
জ্যাকসন হাইটসের কয়েকজন বাসিন্দার মধ্যে প্যারেডের উদ্দেশ্য নিয়েও নানা আলোচনা শোনা যায়। কেউ কেউ মন্তব্য করেন, বাংলাদেশীদের আয়োজনে সাউথ এশিয়ান ইউনিটি প্যারেডের মতো বৃহৎ জনসম্পৃক্ত সাংস্কৃতিক আয়োজনের তুলনায় এই প্যারেডে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ ছিল অত্যন্ত কম। আবার কেউ কেউ এটিকে কমিউনিটির ঐক্যের চেয়ে ক্ষমতা প্রদর্শনের আয়োজন হিসেবে দেখেছেন।
কয়েকজনের অভিযোগ, জ্যাকসন হাইটসের বিভিন্ন অনুষ্ঠানকে ঘিরে ডোনেশন সংগ্রহ, বিভিন্ন ব্যক্তির নাম ও পদ প্রদর্শন এবং সংগঠকদের পরিচিতি তুলে ধরার বিষয়টি অনেক সময় মূল অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্যকে ছাপিয়ে যায়। তবে এসব অভিযোগ ও মন্তব্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত মতামত; এ বিষয়ে আয়োজকদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যারেডের প্রচারসামগ্রীতে উপদেষ্টা, কর্মকর্তা, সংগঠক, সমন্বয়কারী, বাংলাদেশ সোসাইটির বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা এবং সহযোগীদের দীর্ঘ তালিকা প্রকাশ করা হয়েছিল। কিন্তু অনুষ্ঠানের দিন পোস্টারে নাম থাকা অনেক ব্যক্তির উপস্থিতি দেখা যায়নি বলে কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী জানান। ফলে প্রচারণার বিশালতা এবং মাঠের বাস্তবতার মধ্যে পার্থক্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
তবে অনুষ্ঠানে জ্যাকসন হাইটস এলাকাবাসী সংগঠনটির পক্ষে সদস্য সচিব মোহাম্মদ আলম নমী, সংগঠক সাকিল মিয়া , সাপ্তাহিক জেনারেশন এর সম্পাদক ও কলামিস্ট শাহ্ জে চৌধুরী, Shah Group-এর কো-ফাউন্ডার Husneara Choudhury , বিশিষ্ট লেখক ও প্যারেড থিম সং লেখক হুমায়ূন কবীর ঢালী , কমিউনিটির লিডার মোঃ সাখাওয়াত বিশ্বাস , রূপসী চাঁদপুর ফাউন্ডেশন ইনক্ এর সভাপতি বিপ্লব সাহা, সাধারণ সম্পাদক গাজী সোহেল শিশুদের জন্য খেলনা, কেন্ডি ও পানির বোতল বিতরণ করতে দেখা যায়। এ উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখেছেন কেউ কেউ।
প্যারেডে নিউইয়র্কের বিভিন্ন পর্যায়ের কয়েকজন রাজনৈতিক ও কমিউনিটি নেতার উপস্থিতি ছিল। উপস্থিতদের মধ্যে ডিস্ট্রিক্ট লিডার হিরাম মনসেরাতে, ড. দিলীপ নাথ, রোজা সানচেজ, ড. সবিতা দাস ,পাবলিক অ্যাডভোকেট জুমানে উইলিয়ামস এবং কমিউনিটি লিডার শক্তি ডি গুপ্তার নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
সাউথ এশিয়ান ইউনিটি প্যারেডের আয়োজনে বাংলাদেশ সোসাইটি ইনক.-এর বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ততা ছিল। সভাপতি আতাউর রহমান সেলিম, সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আলী এবং সাংস্কৃতিক সম্পাদক অনিক রাজসহ সংগঠনের একাধিক কর্মকর্তা ও সদস্য এতে যুক্ত ছিলেন।
প্যারেডের আয়োজকদের পক্ষ থেকে সাংস্কৃতিক বিষয়ক চেয়ারপার্সন রানো আমেনা নওয়াজ, আহ্বায়ক মহিউদ্দিন দেওয়ান, প্রধান সমন্বয়কারী শাহ শহিদুল হক, সদস্য সচিব মোহাম্মদ আলম নমী, সংগঠক সাকিল মিয়াসহ অনেকে দায়িত্ব পালন করেন। বিভিন্ন পর্যায়ে আরও বহু ব্যক্তি উপদেষ্টা, সমন্বয়কারী, সহ-আহ্বায়ক ও সংগঠক হিসেবে যুক্ত ছিলেন।
এত বড় আয়োজন, দীর্ঘ প্রস্তুতি এবং বিশাল কমিটি থাকা সত্ত্বেও প্যারেডে কেন প্রত্যাশিত জনসম্পৃক্ততা তৈরি হলো না, কেন দক্ষিণ এশিয়ার সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে দৃশ্যমানভাবে সম্পৃক্ত করা গেল না এবং কেন ঘোষিত গুরুত্বপূর্ণ অতিথিদের অধিকাংশ উপস্থিত হলেন না—এসব প্রশ্ন এখন জ্যাকসন হাইটসের কমিউনিটিতে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
দক্ষিণ এশিয়ার ঐক্যের নামে আয়োজিত প্রথম সাউথ এশিয়ান ইউনিটি প্যারেড তাই শেষ পর্যন্ত ঐক্যের বার্তার পাশাপাশি তুলে দিয়েছে আয়োজনের দুর্বলতা, জনসম্পৃক্ততার ঘাটতি এবং ব্যবস্থাপনা নিয়ে নানা প্রশ্ন। জ্যাকসন হাইটসের মতো বহুজাতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে সমৃদ্ধ এলাকায় ভবিষ্যতে এমন আয়োজন করতে হলে শুধু পোস্টারে দীর্ঘ নামের তালিকা নয়, বরং সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ, সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর সক্রিয় সম্পৃক্ততা, সময়ানুবর্তিতা, শৃঙ্খলা এবং আয়োজকদের সমন্বিত আন্তরিকতাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—এমনটাই মনে করছেন কমিউনিটির অনেকেই।



















