সনাতনীদের নিরাপত্তা কোথায়? বাংলাদেশে বর্তমান বাস্তবতা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ
উত্তম কুমার সাহা :
বাংলাদেশে বসবাসরত সনাতন ধর্মাবলম্বীদের জন্য বর্তমান সময়টি নিঃসন্দেহে উদ্বেগের। সাম্প্রতিক কিছু হত্যাকাণ্ড, হামলা, ভয়ভীতি ও নিরাপত্তাহীনতার ঘটনা নতুন করে প্রশ্ন তুলছে—রাষ্ট্র কি তার প্রত্যেক নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছে? বিশেষ করে সমাজে প্রভাবশালী ও দায়িত্বশীল পেশায় থাকা শিক্ষক, সাংবাদিক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, সরকারি কর্মকর্তা, আইনজীবী, ব্যবসায়ী ও সংস্কৃতিকর্মীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে। তাঁদের ওপর কোনো ধরনের পরিকল্পিত হামলা শুধু একজন ব্যক্তি বা একটি পরিবারকে ক্ষতিগ্রস্ত করে না; এর অভিঘাত ছড়িয়ে পড়ে পুরো সমাজে।
রংপুরে একটি হিন্দু পরিবারের চার সদস্য নিহত হওয়ার সাম্প্রতিক ঘটনা এই উদ্বেগকে আরও গভীর করেছে। নিহতদের মধ্যে অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীও ছিলেন। ঘটনার প্রকৃত কারণ ও হত্যার উদ্দেশ্য নিয়ে তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষ হওয়ার আগে ঘটনাটিকে সাম্প্রদায়িক হত্যাকাণ্ড হিসেবে চূড়ান্তভাবে চিহ্নিত করা ঠিক হবে না। কিন্তু একই সঙ্গে এই হত্যাকাণ্ড যে সনাতন সম্প্রদায়ের মধ্যে গভীর আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে, সেটিও অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—কোনো নাগরিক যদি মনে করেন তাঁর ধর্মীয় পরিচয়, সামাজিক অবস্থান, পেশা কিংবা মতাদর্শের কারণে তিনি সহজেই টার্গেটে পরিণত হতে পারেন, তাহলে রাষ্ট্রের প্রতি তাঁর আস্থা কোথায় থাকবে?
সনাতন সমাজে শিক্ষক, সাংবাদিক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, সরকারি কর্মকর্তা কিংবা অন্যান্য পেশাজীবীরা শুধু নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করেন না; তাঁরা সমাজের বিভিন্ন স্তরে নেতৃত্ব ও প্রভাব রাখেন। তাঁদের ওপর হামলা হলে একটি বার্তা ছড়িয়ে পড়ে—সমাজে প্রতিষ্ঠিত, শিক্ষিত ও সচেতন মানুষও নিরাপদ নন। আর এই ভয় যদি ক্রমে সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে তা একটি গভীর সামাজিক সংকটের জন্ম দিতে পারে।
তাই কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে পরিকল্পিত হামলার আলামত পাওয়া গেলে রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে শুরুতেই তা শনাক্ত করতে হবে। ঘটনা ঘটার পর তদন্তের পাশাপাশি ঘটনা ঘটার আগেই সম্ভাব্য ঝুঁকি চিহ্নিত করে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়াই রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ নতুন নয়। অতীতেও বিভিন্ন সময়ে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, উপাসনালয়ে আক্রমণ, বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা এবং ভয়ভীতির অভিযোগ উঠেছে। এসব ঘটনার অনেক ক্ষেত্রেই ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে শুধু সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তাই নয়, বাংলাদেশের সামগ্রিক সামাজিক স্থিতিশীলতাও হুমকির মুখে পড়বে।
বাংলাদেশের রংপুরে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ৪জন সহ বিভিন্ন জেলায় মানুষকে হত্যা করা হচ্ছে তাই প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে জানতে হবে—কে হত্যা করেছে, কেন করেছে, হত্যার আগে কোনো হুমকি ছিল কি না, ধর্মীয় বিদ্বেষের কোনো প্রমাণ আছে কি না, নাকি ব্যক্তিগত শত্রুতা, সম্পত্তি, রাজনৈতিক বিরোধ কিংবা অন্য কোনো অপরাধী চক্র এর সঙ্গে জড়িত।
সত্য উদঘাটনই এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত অপরাধীকে আড়াল করা কিংবা নিরপরাধ কাউকে দায়ী করে তদন্ত শেষ করার সংস্কৃতি থাকলে মানুষের রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা আরও দুর্বল হবে। অতীতের বিতর্কিত তদন্তের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে রংপুরের চার হত্যাকাণ্ডসহ প্রতিটি গুরুতর ঘটনার তদন্ত হতে হবে স্বচ্ছ, পেশাদার, নিরপেক্ষ ও জবাবদিহিমূলক। কোনো ‘জজ মিয়া নাটক’ নয়—মানুষ দেখতে চায় প্রকৃত সত্য এবং প্রকৃত অপরাধীর বিচার।
বর্তমান পরিস্থিতিতে আরেকটি বড় বিপদ হলো গুজব ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাচাইহীন তথ্যের বিস্তার। একটি হত্যাকাণ্ডের পর যদি সত্য-মিথ্যা যাচাই না করে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ছড়ানো হয়, তাহলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে। একইভাবে কোনো সম্প্রদায়ের মধ্যে যদি ক্রমাগত এই ধারণা তৈরি হয় যে রাষ্ট্র তাদের নিরাপত্তা দিতে পারছে না, তাহলে দেশত্যাগের প্রবণতা বাড়তে পারে। একটি দেশের জন্য এর চেয়ে বড় সামাজিক ও মানবিক বিপর্যয় আর কী হতে পারে?
এ কারণে সরকারের এখনই প্রয়োজন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করা, হুমকি ও হামলার অভিযোগকে গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ও সহিংসতার উসকানির বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া এবং হত্যাকাণ্ডের তদন্তে কোনো রাজনৈতিক, প্রশাসনিক বা ধর্মীয় প্রভাবকে প্রশ্রয় না দেওয়া।
বিশেষ করে কোনো ব্যক্তি বা পেশাজীবী গোষ্ঠীকে পরিকল্পিতভাবে টার্গেট করার তথ্য পাওয়া গেলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আগাম ব্যবস্থা নিতে হবে। একটি প্রাণহানি ঘটে যাওয়ার পর তদন্ত করার চেয়ে একটি প্রাণহানি প্রতিরোধ করা রাষ্ট্রের জন্য অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের জন্যও এই মুহূর্তে আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক ও সংগঠিত থাকা জরুরি। কোনো হুমকি, সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড কিংবা সহিংসতার পরিকল্পনার তথ্য পাওয়া গেলে তা উপেক্ষা না করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানাতে হবে। পরিবার, প্রতিবেশী ও সামাজিক সংগঠনগুলোর মধ্যে যোগাযোগ বাড়াতে হবে। তবে এই সতর্কতা কোনোভাবেই প্রতিশোধ, গুজব কিংবা সাম্প্রদায়িক সংঘাতে রূপ নেওয়া উচিত নয়।
বাংলাদেশ কারও একার দেশ নয়। বাংলাদেশ সব নাগরিকের। একজন হিন্দু শিক্ষক নিরাপদে বিদ্যালয়ে যাবেন, একজন মুসলমান চিকিৎসক নিশ্চিন্তে হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করবেন, একজন বৌদ্ধ ব্যবসায়ী নিরাপদে ব্যবসা করবেন, একজন খ্রিস্টান সরকারি কর্মকর্তা নির্ভয়ে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করবেন—এটাই একটি সভ্য, গণতান্ত্রিক ও মানবিক রাষ্ট্রের স্বাভাবিক চিত্র।
আজ যদি একজন হিন্দু শিক্ষক আতঙ্কিত হন, আগামীকাল সেই আতঙ্ক অন্য সম্প্রদায়ের মানুষের দরজাতেও পৌঁছাতে পারে। রাষ্ট্র যখন কোনো নাগরিককে রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থাই।
তাই আজকের সতর্কবার্তা কোনো সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে নয়; বরং রাষ্ট্রের প্রতি, সমাজের প্রতি এবং বিবেকবান মানুষের প্রতি। হত্যার আগে সতর্ক হতে হবে, হুমকির আগে ব্যবস্থা নিতে হবে, গুজবের আগে সত্য যাচাই করতে হবে এবং অপরাধীর ধর্মীয় পরিচয় নয়—অপরাধের প্রমাণকে সামনে রাখতে হবে।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ যেন আর কোনো পরিবারের কান্নায়, কোনো মায়ের সন্তানের লাশে, কোনো শিক্ষকের রক্তে কিংবা কোনো সংখ্যালঘু পরিবারের দেশত্যাগে লেখা না হয়।
রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো—সে তার সবচেয়ে ভীত নাগরিকটিকেও কতটা নিরাপত্তা দিতে পারে।
আজ সেই পরীক্ষার সময়।
উত্তম কুমার সাহা
সম্পাদক ও প্রকাশক , প্রজ্ঞা নিউজ।



















