Logo

ইউএসএ নিউজ    >>   ৯/১১-এর ২৫ বছর—স্মৃতির ভার, আত্মত্যাগের অমর গাথা ও মানবতার অঙ্গীকার: সন্ত্রাসী হামলার ক্ষত আজও বহমান; নিহতদের স্মরণে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে শ্রদ্ধা, নীরবতা ও প্রার্থনা—ঐক্য, সহমর্মিতা ও শান্তির বার্তা নিয়ে ফিরে এলো ৯/১১

৯/১১-এর ২৫ বছর—স্মৃতির ভার, আত্মত্যাগের অমর গাথা ও মানবতার অঙ্গীকার: সন্ত্রাসী হামলার ক্ষত আজও বহমান; নিহতদের স্মরণে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে শ্রদ্ধা, নীরবতা ও প্রার্থনা—ঐক্য, সহমর্মিতা ও শান্তির বার্তা নিয়ে ফিরে এলো ৯/১১

৯/১১-এর ২৫ বছর—স্মৃতির ভার, আত্মত্যাগের অমর গাথা ও মানবতার অঙ্গীকার: সন্ত্রাসী হামলার ক্ষত আজও বহমান; নিহতদের স্মরণে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে শ্রদ্ধা, নীরবতা ও প্রার্থনা—ঐক্য, সহমর্মিতা ও শান্তির বার্তা নিয়ে ফিরে এলো ৯/১১

প্রজ্ঞা নিউজ ডেস্ক, নিউইয়র্ক:
আজ ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের সবচেয়ে বেদনাবিধুর অধ্যায়গুলোর একটি, ২০০১ সালের ৯/১১ সন্ত্রাসী হামলার ২৫তম বার্ষিকী। এক শতাব্দীর চার ভাগের এক ভাগ সময় পেরিয়ে গেলেও সেই দিনের ধ্বংসযজ্ঞ, স্বজন হারানোর কান্না, উদ্ধারকর্মীদের আত্মত্যাগ এবং মানবিক সাহসের স্মৃতি আজও আমেরিকার জাতীয় স্মৃতিতে গভীরভাবে গেঁথে আছে।
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর সকালে আল-কায়েদার ১৯ সদস্য চারটি বাণিজ্যিক বিমান ছিনতাই করে সমন্বিত হামলা চালায়। দুটি বিমান নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের টুইন টাওয়ারে, একটি ভার্জিনিয়ার পেন্টাগনে আঘাত হানে। চতুর্থ বিমানটি যাত্রী ও ক্রুদের প্রতিরোধের পর পেনসিলভানিয়ার শ্যাঙ্কসভিলের কাছে একটি মাঠে বিধ্বস্ত হয়। ওই হামলায় প্রায় ৩ হাজার মানুষ প্রাণ হারান।
নিউইয়র্কের লোয়ার ম্যানহাটনে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের ধ্বংসাবশেষের নিচে চাপা পড়ে যায় অসংখ্য স্বপ্ন, পরিবার ও ভবিষ্যৎ। অফিসগামী মানুষ, বিমানযাত্রী, অগ্নিনির্বাপক, পুলিশ কর্মকর্তা, জরুরি উদ্ধারকর্মী—কেউই সেদিনের বিভীষিকা থেকে রক্ষা পাননি। শুধু নিউইয়র্কেই নয়, পেন্টাগন ও ফ্লাইট ৯৩-এর ঘটনাস্থলেও মানুষের জীবন চিরতরে বদলে যায়।
৯/১১-এর স্মরণে সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে প্রথম সাড়াদানকারী বা first responders-দের আত্মত্যাগ। অগ্নিনির্বাপক, পুলিশ কর্মকর্তা, জরুরি চিকিৎসাকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবকেরা নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অন্যদের উদ্ধারে ছুটে গিয়েছিলেন। নিউইয়র্কের ফায়ার ডিপার্টমেন্টের ৩৪৩ জন সদস্য সেদিন প্রাণ হারান। তাঁদের আত্মত্যাগ আজও শহরের মানুষের কাছে গভীর শ্রদ্ধার প্রতীক।
ধ্বংসস্তূপ সরানো, নিখোঁজদের খোঁজ করা এবং উদ্ধারকাজ পরিচালনার পরও ৯/১১-এর প্রভাব শেষ হয়ে যায়নি। বিষাক্ত ধুলা ও ধ্বংসাবশেষের সংস্পর্শে আসা বহু উদ্ধারকর্মী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, বাসিন্দা ও পরবর্তী সময়ের কর্মী দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখোমুখি হন। অনেকেই পরবর্তী বছরগুলোতে অসুস্থ হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। ফলে ৯/১১ শুধু একটি দিনের ট্র্যাজেডি নয়, বহু দশক ধরে চলমান এক মানবিক ও জনস্বাস্থ্য সংকটের নামও।
৯/১১-এর ২৫তম বার্ষিকী উপলক্ষে নিউইয়র্কের National September 11 Memorial & Museum-এ নিহতদের স্মরণে বিশেষ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হচ্ছে। স্বজনেরা নিহতদের নাম পাঠ করছেন, আর পুরো দেশ শোক, শ্রদ্ধা ও আত্মত্যাগের ইতিহাস স্মরণ করছে। এ বছর ৯/১১-সম্পর্কিত অসুস্থতা বা আঘাতের কারণে পরবর্তী সময়ে মৃত্যুবরণকারীদের সম্মান জানাতেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
গ্রাউন্ড জিরোর স্মৃতিসৌধে পাশাপাশি থাকা দুটি বিশাল জলাধার আজও সেই দুই টাওয়ারের অস্তিত্বের নীরব সাক্ষ্য বহন করছে। জলধারা নিচের দিকে প্রবাহিত হয়ে যেন মনে করিয়ে দেয়—মানুষ চলে যায়, কিন্তু তাঁদের স্মৃতি, ভালোবাসা ও আত্মত্যাগ ইতিহাসে থেকে যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য স্থানেও ৯/১১ উপলক্ষে স্মরণসভা, প্রার্থনা, নীরবতা পালন ও শ্রদ্ধা নিবেদনের আয়োজন করা হয়েছে। পেন্টাগন এবং পেনসিলভানিয়ার Flight 93 National Memorial-এও নিহতদের স্মরণে কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
৯/১১-এর পর যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা, পররাষ্ট্রনীতি, বিমান চলাচল এবং সন্ত্রাসবিরোধী কর্মকৌশলে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। বিশ্বরাজনীতিতেও এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়ে। তবে ২৫ বছর পর এই দিনটি স্মরণ করার সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে—সেই ভয়াবহতার মধ্য থেকে মানবতা কী শিক্ষা নিয়েছে?
সেদিন ধর্ম, বর্ণ, ভাষা কিংবা জাতীয়তার বিভাজন ছাপিয়ে মানুষ মানুষকে বাঁচাতে এগিয়ে এসেছিল। অচেনা মানুষকে আশ্রয় দেওয়া, আহতদের সহায়তা করা, রক্তদান, উদ্ধারকাজে অংশ নেওয়া এবং স্বজন হারানো পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানো—এসব মানবিক কর্মকাণ্ড ৯/১১-এর অন্ধকারের মধ্যেও আশার আলো দেখিয়েছিল।
একই সঙ্গে ৯/১১-এর পর মুসলিম আমেরিকানদের বিরুদ্ধে বৈষম্য, সন্দেহ ও বিদ্বেষের ঘটনাও দেশটির সামাজিক বাস্তবতায় আলোচিত হয়েছে। তাই এই দিনটির স্মরণ কেবল নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা নয়; বরং ঘৃণা, অসহিষ্ণুতা ও অন্যায় বৈষম্যের বিরুদ্ধে মানবিক অবস্থান নেওয়ারও একটি সুযোগ।
৯/১১-এর ২৫ বছর পর যুক্তরাষ্ট্রে এমন একটি প্রজন্ম বেড়ে উঠেছে, যারা নিজের চোখে সেই হামলা দেখেনি। তাদের কাছে ৯/১১ এখন ইতিহাসের পাঠ, পরিবারের স্মৃতি, ছবি, ভিডিও এবং স্মৃতিসৌধের মাধ্যমে পরিচিত একটি ঘটনা। এই কারণে ৯/১১ Memorial & Museum-এর শিক্ষা কার্যক্রম নতুন প্রজন্মকে সেই দিনের ঘটনা, নিহতদের জীবন, উদ্ধারকর্মীদের সাহস এবং পরবর্তী সময়ের সামাজিক প্রভাব সম্পর্কে জানাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
নিউইয়র্কের বাংলাদেশি-আমেরিকান কমিউনিটিও প্রতিবছরের মতো এবারও ৯/১১-এর নিহতদের স্মরণ করছে। এই শহর বহু জাতি, ধর্ম ও সংস্কৃতির মানুষের আবাসস্থল। ৯/১১-এর স্মৃতি নিউইয়র্কের প্রতিটি কমিউনিটির মতো বাংলাদেশি আমেরিকানদের কাছেও মানবিক বেদনা, সহমর্মিতা ও ঐক্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক।
কমিউনিটির মানুষের প্রত্যাশা, ৯/১১-এর আত্মত্যাগ ও মানবিক সাহসের ইতিহাস নতুন প্রজন্মকে ঘৃণার পরিবর্তে ভালোবাসা, বিভেদের পরিবর্তে ঐক্য এবং সহিংসতার পরিবর্তে শান্তির পথে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করবে।
২৫ বছর পরও ৯/১১ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সন্ত্রাস ধ্বংস করতে পারে, কিন্তু মানবতার সাহস, সহমর্মিতা ও ঐক্যের শক্তিকে পরাজিত করতে পারে না। নিহতদের স্মৃতি হোক শান্তি, সহনশীলতা ও মানবিক মর্যাদা রক্ষার অঙ্গীকার।