যেদিন শেখ হাসিনা ফিরবেন, সেদিন কি জেগে উঠবে বাংলাদেশ? একটি প্রত্যাবর্তন, একটি দেশের স্মৃতি ও ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন?
উত্তম কুমার সাহা:
গ্রামের মেঠোপথ। দুপুরের আকাশে হঠাৎ একটি বিমান উড়ে গেল। বিমানের শব্দ শুনে ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন মানুষ। কেউ আকাশের দিকে তাকালেন, কেউ শিশুকে কোলে নিয়ে দৌড়ে উঠানে এলেন—শুধু একবার বিমানটিকে চোখে দেখবেন বলে।
বাংলাদেশের মানুষের রাজনৈতিক ইতিহাসেও হয়তো এমনই এক দৃশ্যের কল্পনা করা যায়—যেদিন শেখ হাসিনা দেশে ফিরবেন।
বিমানবন্দরের পথ থেকে রাজপথ, শহর থেকে গ্রাম—সেদিন মানুষের প্রতিক্রিয়া কী হবে, সেটি এখনই নিশ্চিত করে বলা যায় না। কিন্তু শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে গভীর আবেগ, বিতর্ক, প্রত্যাশা ও প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করবে, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই।
কারণ শেখ হাসিনা বাংলাদেশের রাজনীতির এমন একজন ব্যক্তিত্ব, যার সঙ্গে দেশের গত কয়েক দশকের রাজনৈতিক ইতিহাস ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম। এরপর কেটে গেছে পাঁচ দশকেরও বেশি সময়। এই দীর্ঘ সময়ে সরকার পরিবর্তন হয়েছে বহুবার, এসেছে নানা রাজনৈতিক পালাবদল। বাংলাদেশ দারিদ্র্য ও অনুন্নয়নের নানা ধাপ পেরিয়ে মধ্যম আয়ের দেশের পথে এগিয়েছে। অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ, নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ, তথ্যপ্রযুক্তি, শিল্প ও রপ্তানি—বিভিন্ন ক্ষেত্রে গত কয়েক দশকে দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে।
বিশ্বব্যাংকের তথ্যও বলছে, বাংলাদেশের গত এক দশকের গড় জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ৬ শতাংশ; তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই প্রবৃদ্ধির গতি কমেছে। ২০২৬ সালের এপ্রিলে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি FY26-এ ৩.৯ শতাংশে নেমে আসার পূর্বাভাস দেয় এবং মূল্যস্ফীতি, দারিদ্র্য, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা ও বিনিয়োগের স্থবিরতাকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করে।
অর্থাৎ বাংলাদেশের সামনে আজকের সংকটকে কেবল একজন ব্যক্তি বা একটি সরকারের সাফল্য-ব্যর্থতার সরল হিসাব দিয়ে ব্যাখ্যা করা কঠিন। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা, অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং মানুষের নিরাপত্তার প্রশ্ন।
তবু মানুষের স্মৃতি বড় বিচিত্র।
ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় যে নেতাকে নিয়ে বিরোধিতা হয়েছে, ক্ষমতা হারানোর পর সেই নেতার সময়ের কিছু অর্জন মানুষ নতুন করে স্মরণ করতে পারে। আবার একই সময়ে সেই শাসনামলের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ ও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের অভিজ্ঞতাও ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকে।
শেখ হাসিনাকে ঘিরে বাংলাদেশের বাস্তবতাও তাই একরৈখিক নয়।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলন, প্রাণহানি এবং রাজনৈতিক পরিবর্তন বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর জানিয়েছে, ওই সময় ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘন ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছিল; একই প্রতিবেদনে আন্দোলনের পর প্রতিশোধমূলক হামলায় আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
৫ আগস্ট ২০২৪ শেখ হাসিনা বাংলাদেশ ত্যাগ করে ভারতে যান। এরপর প্রায় দুই বছরেরও বেশি সময় তিনি দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। ২০২৫ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাকে অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেয়। শেখ হাসিনা ওই বিচারকে প্রত্যাখ্যান করে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে অভিহিত করেছেন। ভারতকে তার প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানানো হলেও ভারত জানিয়েছে, বিষয়টি তারা আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে পরীক্ষা করছে।
এখানেই প্রশ্নটি আরও বড় হয়ে ওঠে—
শেখ হাসিনা কি ফিরবেন?
তিনি নিজেই ২০২৬ সালের আগস্টে সাংবাদিকদের বলেছেন যে তিনি ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশে ফেরার পরিকল্পনা করছেন—তবে তার প্রত্যাবর্তনের বাস্তব রাজনৈতিক ও আইনি পরিস্থিতি এখনো অনিশ্চিত।
যদি তিনি কখনো দেশে ফেরেন, সেই প্রত্যাবর্তন নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের জন্য একটি ঐতিহাসিক রাজনৈতিক মুহূর্ত হবে।
কিন্তু সেই মুহূর্ত কেমন হবে?
মানুষ কি বিমানবন্দরের পথে ছুটবে?
রাজপথ কি জনসমুদ্রে পরিণত হবে?
যারা আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সুফল পেয়েছেন বলে মনে করেন, তারা কি তাকে স্বাগত জানাবেন?
যারা তার শাসনামলে নির্যাতন, রাজনৈতিক নিপীড়ন বা প্রাণহানির অভিযোগ তুলেছেন, তারা কী অবস্থান নেবেন?
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ কী বলবেন?
তরুণ প্রজন্ম কী সিদ্ধান্ত নেবে?
সুশীল সমাজ, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী ও সাধারণ নাগরিক—কার কণ্ঠ কতটা জোরালো হবে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আজ দেওয়া সম্ভব নয়।
তবে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক বাস্তবতা দেখাচ্ছে, রাজনৈতিক বিভাজন এখনো গভীর। অর্থনীতিতেও চাপ রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের মূল্যায়নে প্রবৃদ্ধির ধীরগতি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দারিদ্র্য বৃদ্ধি, দুর্বল ব্যাংকিং খাত এবং কম বিনিয়োগের বিষয়গুলো উঠে এসেছে। ২০২৫ সালে জাতীয় দারিদ্র্যের হার ২১.৪ শতাংশে পৌঁছেছে বলে বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে।
ব্যাংকিং খাত নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর নাগাদ খেলাপি ঋণের অনুপাত ৩০.৬ শতাংশে পৌঁছেছিল বলে বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৬ সালের জুনে ব্যাংকিং খাতকে শক্তিশালী করার জন্য বিশ্বব্যাংক ৪৫০ মিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন অনুমোদন করেছে।
অন্যদিকে, নিরাপত্তা, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, মানবাধিকার ও সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়েও দেশে-বিদেশে উদ্বেগ রয়েছে। ফলে বাংলাদেশের মানুষ আজ যে প্রশ্নটি সবচেয়ে বেশি করতে চায়, সেটি শুধু কে ক্ষমতায় থাকবে—তা নয়।
প্রশ্ন হলো—
বাংলাদেশ আবার কবে স্থিতিশীল হবে?
কবে মানুষ নিরাপদে ঘরে ফিরতে পারবে?
কবে রাজনৈতিক পরিচয় মানুষের নিরাপত্তার কারণ হবে না?
কবে ভিন্নমত মানেই শত্রুতা হবে না?
শেখ হাসিনার সমর্থকদের কাছে তার প্রত্যাবর্তন হতে পারে হারানো রাজনৈতিক অধিকার ফিরে পাওয়ার প্রতীক। তার বিরোধীদের কাছে বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন অর্থ বহন করতে পারে। আর রাষ্ট্রের কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হবে—আইন, বিচার, মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণের মধ্যে কীভাবে একটি গ্রহণযোগ্য ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা যায়।
সুতরাং শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের কল্পিত দৃশ্যকে শুধু আবেগ দিয়ে দেখা যথেষ্ট নয়।
সেদিন যদি সত্যিই মানুষ ঘর থেকে বেরিয়ে আসে, সেটি যেন আরেকটি সংঘাতের সূচনা না হয়। সেটি যেন হয় বাংলাদেশের মানুষের শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক মতপ্রকাশের দিন।
যদি মানুষের ঢল নামে, সেই ঢল যেন কোনো পক্ষের বিরুদ্ধে প্রতিশোধের ঢল না হয়।
যদি কান্না আসে, সেই কান্না যেন নতুন রক্তপাতের কারণ না হয়।
যদি আনন্দ আসে, সেই আনন্দ যেন অন্যের ভয় হয়ে না দাঁড়ায়।
বাংলাদেশ বহু রক্ত, ত্যাগ ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে জন্ম নেওয়া একটি দেশ। এই দেশের ভবিষ্যৎ কোনো একক ব্যক্তির হাতে নয়—রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান, জনগণের অধিকার, আইনের শাসন এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ওপরই তার ভবিষ্যৎ নির্ভর করে।
তবু ইতিহাসে কিছু প্রত্যাবর্তন থাকে, যেগুলো কেবল একজন মানুষের ফিরে আসা নয়—একটি জাতির স্মৃতি, ক্ষোভ, ভালোবাসা, প্রত্যাশা ও প্রশ্নকে আবার সামনে নিয়ে আসে।
শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনও যদি কখনো ঘটে, সেটি তেমনই এক মুহূর্ত হতে পারে।
সেদিন হয়তো কোনো গ্রামের মানুষ আবার আকাশের দিকে তাকাবে।
দূরে একটি বিমান উড়ে যাবে।
বিমানের শব্দ শুনে ঘর থেকে বেরিয়ে আসবে মানুষ।
কেউ হয়তো বলবে—
শেখ হাসিনা কি ফিরছেন?
আর সেই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে বাংলাদেশের—
এই প্রত্যাবর্তন কি নতুন সংঘাতের দরজা খুলবে, নাকি বাংলাদেশের রাজনীতিকে আইন, গণতন্ত্র, শান্তি ও মানুষের অধিকারের নতুন আলোচনার দিকে নিয়ে যাবে?
ইতিহাসের উত্তর ভবিষ্যৎই দেবে।
উত্তম কুমার সাহা, সম্পাদক ও প্রকাশক—প্রজ্ঞা নিউজ



















