Logo

আন্তর্জাতিক    >>   নিউইয়র্কে তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ ঘিরে বিএনপিতে অসন্তোষ, সাংগঠনিক সমন্বয় নিয়ে প্রশ্ন

নিউইয়র্কে তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ ঘিরে বিএনপিতে অসন্তোষ, সাংগঠনিক সমন্বয় নিয়ে প্রশ্ন

নিউইয়র্কে তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ ঘিরে বিএনপিতে অসন্তোষ, সাংগঠনিক সমন্বয় নিয়ে প্রশ্ন

প্রজ্ঞা নিউজ ডেস্ক, হাকিকুল ইসলাম খোকন:

জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্র সফরে আসা বিএনপির চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গিয়ে নিউইয়র্কে দলীয় নেতা-কর্মীদের একাংশকে ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে। সাক্ষাতের সুযোগ, প্রবেশের অনুমতি এবং কর্মসূচি সমন্বয় নিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিভিন্ন স্টেট থেকে আসা বিএনপির নেতা-কর্মীরা। তাঁদের অভিযোগ, দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামে যুক্ত থাকার পরও দলের চেয়ারম্যানের সঙ্গে প্রত্যাশিত সময়ে সাক্ষাৎ ও কুশলাদি বিনিময়ের সুযোগ পাননি অনেকে।
তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাতের আশায় যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্টেট থেকে বিএনপির নেতা-কর্মীরা পাঁচ দিন আগেই নিউইয়র্কে এসে হোটেল-মোটেলে অবস্থান নেন। জেএফকে বিমানবন্দরে তাঁকে স্বাগত জানানো, জাতিসংঘ সদর দপ্তরের সামনে শান্তি সমাবেশ এবং ম্যানহাটানের গ্র্যান্ড হায়াত হোটেলের সামনে আওয়ামী লীগকে প্রতিহত করার কর্মসূচিতেও তাঁরা অংশ নেন।
কিন্তু দলীয় চেয়ারম্যানের সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাতের ব্যবস্থা নিয়ে শেষ পর্যন্ত অসন্তোষ দেখা দেয়। হোটেলের করিডোরে অপেক্ষমাণ নেতা-কর্মীদের মধ্যে কে আগে সাক্ষাৎ করবেন, তা নিয়ে ধাক্কাধাক্কি ও বাদানুবাদের ঘটনাও ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ডাকতে হয়। এ অবস্থায় অনেক নেতা-কর্মী তারেক রহমানের সঙ্গে কুশলাদি বিনিময়ের সুযোগ না পেয়ে হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। কেউ কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নিজেদের অসন্তোষের কথা তুলে ধরেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, পর্যায়ক্রমে সাক্ষাতের জন্য হোটেলের করিডোরে অন্তত ২২০ জন নেতা-কর্মী অপেক্ষা করছিলেন। তাঁদের মধ্যে প্রায় একশ জন সাক্ষাতের সুযোগ পান। এ সময় তারেক রহমানের পাশে ছিলেন আব্দুল লতিফ সম্রাট, গিয়াস আহমেদ, জিল্লুর রহমান, মিজানুর রহমান ভূইয়া মিল্টন, ফয়সল চৌধুরী, নাহিদুল হকসহ যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির কয়েকজন নেতা। একপর্যায়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবীরও সেখানে উপস্থিত হন। পরে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্সের (এসএসএফ) অনুমতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতাদের কয়েকজন পর্যায়ক্রমে তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
বিএনপির কেন্দ্রীয় এক নেতার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় নেতা-কর্মীদের অগ্রাধিকার দিয়ে নিউইয়র্কসহ বিভিন্ন স্টেটের বিএনপি, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাদের সমন্বয়ে প্রায় ৩০০ জনের একটি তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছিল। তালিকায় নিউইয়র্ক স্টেট ও নিউইয়র্ক মহানগর বিএনপির সুপার ফাইভের নেতারাও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তবে তালিকাটি ২৪ সেপ্টেম্বর রাতে এসএসএফের কাছে হস্তান্তর করায় ২৫ সেপ্টেম্বর জুমার নামাজের পর সবার মধ্যে প্রবেশপাস বিতরণ করা সম্ভব হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
তারেক রহমানের সঙ্গে নেতা-কর্মীদের সাক্ষাৎ এবং নাগরিক সংবর্ধনার কর্মসূচি সমন্বয়ের দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিএনপির তৃণমূলের কয়েকজন নেতা। তাঁদের অভিযোগ, বিএনপির কেন্দ্রীয় আন্তর্জাতিক সম্পাদক আনোয়ার হোসেন খোকনের ওপর এসব কর্মসূচি সমন্বয়ের দায়িত্ব থাকলেও যথাযথ পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার অভাবে পরিস্থিতি জটিল হয়েছে। এ বিষয়ে আনোয়ার হোসেন খোকনের বক্তব্য জানা যায়নি।
তারেক রহমানের সম্মানে নিউইয়র্কে একটি নাগরিক সংবর্ধনার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই কর্মসূচি বাতিল হওয়ায় টাইমস স্কয়ারের কাছে ম্যারিয়ট হোটেলের একটি মিলনায়তনে দলীয় নেতা-কর্মীদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতের বিকল্প পরিকল্পনা করা হয়। তবে নিরাপত্তা-সংক্রান্ত অনুমতি না পাওয়ায় সেই উদ্যোগও বাস্তবায়িত হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
সাংগঠনিক কমিটি অনুমোদন না পাওয়ায় হতাশা
তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ পাওয়া কয়েকজন নেতা যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির সাংগঠনিক সমস্যার বিষয়টিও তাঁর কাছে তুলে ধরেন বলে জানা গেছে। তাঁদের অভিযোগ, প্রায় ২৮ মাস আগে নিউইয়র্ক স্টেট, নিউইয়র্ক মহানগরসহ যুক্তরাষ্ট্রের ১৩টি স্টেটে বিএনপির পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট আংশিক কমিটি গঠন করা হয়। এসব কমিটি ‘সুপার ফাইভ’ নামে পরিচিত। তখন দ্রুত পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করে অনুমোদনের জন্য কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছে পাঠানোর কথা থাকলেও দীর্ঘ সময়েও সেই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়নি বলে তাঁরা অভিযোগ করেন।
এ কারণে বিভিন্ন স্টেটে দলীয় কার্যক্রম পরিচালনা ও নেতৃত্বের সমন্বয় নিয়ে হতাশা তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট নেতারা মনে করছেন। সাক্ষাতের সুযোগ পাওয়া কয়েকজন নেতা তারেক রহমানের কাছে বিষয়টি তুলে ধরেন। বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানা গেছে, তারেক রহমান তাঁদের সাংগঠনিক সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন।
এ ছাড়া, যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটি ভেঙে দেওয়ার পর দীর্ঘ ১৪ বছরেও নতুন কমিটির অনুমোদন না আসার বিষয়টিও দলীয় নেতা-কর্মীদের অসন্তোষের অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। তাঁদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে পূর্ণাঙ্গ সাংগঠনিক কাঠামো না থাকায় যুক্তরাষ্ট্রে বিএনপির কার্যক্রম পরিচালনা এবং নেতা-কর্মীদের মধ্যে সমন্বয় প্রতিষ্ঠায় সমস্যা তৈরি হচ্ছে।
শেষ দিনে সবার সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়
তারেক রহমান ২১ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের নেতা হিসেবে নিউইয়র্কে আসেন এবং ম্যানহাটানের গ্র্যান্ড হায়াত হোটেলে অবস্থান করেন। জাতিসংঘের বিভিন্ন কর্মসূচি এবং বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় বৈঠক নিয়ে ব্যস্ত থাকায় তিনি দলীয় নেতা-কর্মীদের প্রত্যাশা অনুযায়ী সময় দিতে পারেননি বলে বিএনপি নেতা গিয়াস আহমেদ ও আব্দুল লতিফ সম্রাট পৃথকভাবে জানান।
তাঁরা বলেন, তারেক রহমানের আন্তরিকতার অভাব ছিল না। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী নেতা-কর্মীদের ত্যাগ ও অবদানের কথা তিনি জানেন। তবে ব্যস্ত কর্মসূচির কারণে সবার সঙ্গে পর্যাপ্ত সময় কাটানো সম্ভব হয়নি।
২৫ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় জেএফকে বিমানবন্দরের উদ্দেশে হোটেল ত্যাগের সময় লবিতে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ানো নেতা-কর্মীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন তারেক রহমান। এতে আগে সাক্ষাতের সুযোগ না পাওয়া অনেক নেতা-কর্মী শেষ মুহূর্তে তাঁর সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়ের সুযোগ পান।
তারেক রহমানের যুক্তরাষ্ট্র সফরকে কেন্দ্র করে বিএনপির নেতা-কর্মীদের ব্যাপক উপস্থিতি ও আগ্রহের পাশাপাশি সাক্ষাৎ ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা-সংক্রান্ত সমন্বয় এবং দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক জটিলতার বিষয়গুলোও সামনে এসেছে। দলীয় নেতা-কর্মীদের প্রত্যাশা, কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের উদ্যোগে এসব সমস্যার সমাধান হলে যুক্তরাষ্ট্রে বিএনপির সাংগঠনিক কার্যক্রম আরও সুসংগঠিত হবে।