শেষ মুহূর্তে আদালতের স্থগিতাদেশ, নিউইয়র্কে বাংলাদেশ সোসাইটির নির্বাচন নিয়ে তোলপাড়: ৩৫ হাজার ভোটারের ভোটাধিকার নিয়ে প্রশ্ন, নির্বাচনী প্রস্তুতি ও ব্যয় নিয়ে অনিশ্চয়তা, ৫ নভেম্বর পরবর্তী শুনানি
উত্তম কুমার সাহা, শক্তি ডি গুপ্তা ( ক্রাইম রিপোর্টার ) প্রজ্ঞা নিউজ ডেস্ক, নিউইয়র্ক:
নিউইয়র্ক প্রবাসী বাংলাদেশিদের অন্যতম বৃহৎ সামাজিক সংগঠন বাংলাদেশ সোসাইটির বহুল আলোচিত ২০২৬ সালের নির্বাচন শেষ মুহূর্তে আদালতের নির্দেশে স্থগিত হয়ে গেছে। আগামী ২৫ অক্টোবর ২০২৬ রোববার অনুষ্ঠেয় এ নির্বাচন স্থগিতের নির্দেশ আসে ২৩ অক্টোবর ২০২৬ শুক্রবার। নির্বাচনের মাত্র ৪৮ ঘণ্টারও কম সময় আগে আদালতের এ সিদ্ধান্তে প্রার্থী, সমর্থক ও সাধারণ ভোটারদের মধ্যে দেখা দিয়েছে হতাশা, ক্ষোভ ও অনিশ্চয়তা। নির্বাচন ঘিরে দীর্ঘদিনের প্রচার-প্রচারণা, সাংগঠনিক প্রস্তুতি এবং বিপুল অর্থব্যয়ের পর এমন পরিস্থিতিতে প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটিতে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা।
মামলাকারী ওসমান চৌধুরীর দাবি, বাংলাদেশ সোসাইটির নির্বাচন স্থগিতের বিষয়ে আদালত সম্মত হয়েছেন। তবে আদালতের নির্দেশের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ, মামলার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এবং পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে জানা যায়নি। পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে ৫ নভেম্বর ২০২৬ ।
নির্বাচনের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন, শেষ মুহূর্তে স্থগিতাদেশ
বাংলাদেশ সোসাইটির ২০২৬ সালের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নিউইয়র্কের বাংলাদেশি কমিউনিটিতে কয়েক মাস ধরে উৎসবমুখর নির্বাচনী পরিবেশ বিরাজ করছিল। সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ বিভিন্ন পদে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা ভোটারদের সমর্থন আদায়ে সভা-সমাবেশ, প্রচার-প্রচারণা ও গণসংযোগ চালিয়ে আসছিলেন।
নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য নিউইয়র্ক সিটির পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ভোটকেন্দ্র নির্ধারণ করা হয়েছিল। ভোটগ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় মেশিন ভাড়াসহ অন্যান্য প্রস্তুতিও সম্পন্ন করা হয়। ৩৫ হাজারের বেশি ভোটারকে কেন্দ্র করে নির্বাচনী আয়োজন ঘিরে ছিল ব্যাপক কর্মযজ্ঞ।
কিন্তু নির্বাচনের মাত্র দুই দিন আগে আদালতের স্থগিতাদেশে সব প্রস্তুতি কার্যত অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। ভোটকেন্দ্র, ভোটগ্রহণের সরঞ্জাম, ব্যবস্থাপনা ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক খাতে ইতোমধ্যে যে অর্থ ব্যয় হয়েছে, তার আর্থিক চাপ শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ সোসাইটির তহবিলের ওপর পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
নির্বাচন পিছিয়ে যাওয়ায় নতুন করে ভোটগ্রহণের তারিখ নির্ধারণ, কেন্দ্র ব্যবস্থাপনা এবং নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাব নিয়েও সংগঠনকে জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হতে পারে।
কী কারণে আদালতের হস্তক্ষেপ, উঠছে ভোটার তালিকা ও প্রার্থীতা নিয়ে প্রশ্ন
নির্বাচন স্থগিতের পেছনে কী কী অভিযোগ রয়েছে, তা নিয়ে কমিউনিটিতে নানা আলোচনা চলছে। সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, মামলার অভিযোগের মধ্যে রয়েছে সদস্যপদ বাতিল, প্রার্থীতা বাতিল, নির্বাচনে অংশগ্রহণে বাধা, ভোটার তালিকার বৈধতা এবং মনোনয়ন ফি ও নির্বাচনী প্যাকেজের অর্থ আদায়সংক্রান্ত বিষয়।
অভিযোগ উঠেছে, আদালতে মামলা চলমান থাকা অবস্থায় কিছু সদস্যের সদস্যপদ ও প্রার্থীতা নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এসব অভিযোগের পাশাপাশি ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ সোসাইটির নির্বাচনে ৩৫ হাজারের বেশি ভোটার নিবন্ধিত হওয়ার কথা জানানো হয়েছে। তবে অভিযোগ রয়েছে, তালিকায় অন্তর্ভুক্ত অনেক সদস্যই নিজেদের ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত হওয়ার বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন। ফলে এত বিপুলসংখ্যক ভোটারের তালিকা কীভাবে প্রস্তুত করা হয়েছে, সদস্যদের তথ্য যাচাই কীভাবে সম্পন্ন হয়েছে এবং ভোটারদের কাছে যথাযথভাবে তথ্য পৌঁছেছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
এ ছাড়া মনোনয়ন ফি ও নির্বাচনী প্যাকেজের নির্ধারিত ৫০০ ডলারের অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগও আলোচনায় এসেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে নির্বাচন কমিশন বা বাংলাদেশ সোসাইটির আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা এখনো পাওয়া যায়নি।
অভিযোগগুলোর সত্যতা, মামলার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ এবং আদালতের আদেশের সুনির্দিষ্ট ভিত্তি জানতে সংশ্লিষ্ট নথি ও আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের অপেক্ষা রয়েছে।
আদালতের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সেলিম-আলী পরিষদের প্রচারণা স্থগিত
আদালতের স্থগিতাদেশের পর নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী সেলিম-আলী পরিষদ তাদের সব ধরনের নির্বাচনী কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে।
পরিষদের সভাপতি প্রার্থী আতাউর রহমান সেলিম ও সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী মোহাম্মদ আলী স্বাক্ষরিত এক জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বাংলাদেশ সোসাইটির নির্বাচন-সংক্রান্ত একটি মামলার পরিপ্রেক্ষিতে আদালতের পক্ষ থেকে সাময়িক স্থগিতাদেশ এসেছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে আদালতের পরবর্তী সিদ্ধান্ত ও শুনানি না হওয়া পর্যন্ত সেলিম-আলী পরিষদের পক্ষ থেকে নির্বাচনী সব সভা-সমাবেশ, মিছিল, গণর্যালি ও প্রচারণা আপাতত স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
পরিষদের নেতৃবৃন্দ, প্রার্থী, কর্মী, সমর্থক ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের শান্ত থেকে ধৈর্য ও সহনশীলতা বজায় রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে। পাশাপাশি সমর্থকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত ও কর্মসূচি যথাসময়ে জানানো হবে বলেও বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়।
নির্বাচন কমিশনের সংবাদ সম্মেলন আজ
বাংলাদেশ সোসাইটির প্রধান নির্বাচন কমিশনার আবু নাসের জানিয়েছেন, নির্বাচন স্থগিতের বিষয়ে নির্বাচন কমিশন সংবাদ সম্মেলন করে বিস্তারিত তথ্য জানাবে।
এদিকে নির্বাচন কমিশনার মিয়া মোহাম্মদ দুলাল জানান, ২৩ অক্টোবর শুক্রবার রাত ৮টায় বাংলাদেশ সোসাইটির কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন আহ্বান করেছে নির্বাচন কমিশন। সেখানে আদালতের নির্দেশ, নির্বাচনের বর্তমান পরিস্থিতি এবং পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরা হবে।
কমিশনের আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের অপেক্ষায় রয়েছেন প্রার্থী, ভোটার ও কমিউনিটির নেতৃবৃন্দ। আদালতের নির্দেশের পর নির্বাচন কমিশন কী ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করবে এবং নতুন নির্বাচনী সময়সূচি নির্ধারণের বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, তা নিয়ে রয়েছে ব্যাপক আগ্রহ।
আট বছর পর আবারও নির্বাচনের আগে আইনি জটিলতা
বাংলাদেশ সোসাইটির নির্বাচন ঘিরে আদালতের হস্তক্ষেপ এবারই প্রথম নয়। এর আগে ২০১৮ সালেও সংগঠনটির নির্বাচন নিয়ে আইনি জটিলতা তৈরি হয়েছিল।
সে সময় সংগঠনের সাবেক কর্মকর্তা ওসমান চৌধুরী ভোটার তালিকা, নির্বাচন পরিচালনা এবং ভোটগ্রহণের নিয়মকানুন নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ তুলে কুইন্স কাউন্টি আদালতের শরণাপন্ন হন। আদালত তখন সোসাইটি কর্তৃপক্ষকে অভিযোগের জবাব দিতে ২০ দিনের সময় দিয়েছিলেন।
একই বছরের অক্টোবরে আরও কয়েকজন সদস্য পৃথক মামলা করেন। পরবর্তী সময়ে আইনি জটিলতার কারণে সে বছরের নির্বাচনও স্থগিত হয়ে যায়।
আট বছর পর আবারও নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে আদালতের হস্তক্ষেপে ভোট স্থগিত হওয়ায় বাংলাদেশ সোসাইটির নির্বাচন পরিচালনা, সদস্যপদ ব্যবস্থাপনা, ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা এবং সাংগঠনিক জবাবদিহি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
ভোটারদের হতাশা, কমিউনিটিতে চলছে নানা আলোচনা
নির্বাচনকে ঘিরে দীর্ঘদিনের প্রস্তুতি ও প্রচারণার পর ভোট স্থগিত হওয়ায় সাধারণ ভোটারদের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে। অনেক ভোটার নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। প্রার্থী ও সমর্থকদের মধ্যেও নির্বাচনী কার্যক্রম নিয়ে ছিল ব্যাপক ব্যস্ততা।
নির্বাচন স্থগিত হওয়ার পর কমিউনিটিতে এখন প্রধান আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে, কেন নির্বাচনের এত কাছাকাছি সময়ে আদালতের হস্তক্ষেপের পরিস্থিতি তৈরি হলো, অভিযোগগুলোর যথাযথ নিষ্পত্তি কেন আগে করা সম্ভব হয়নি এবং নির্বাচন আয়োজনের বিপুল ব্যয়ের দায়ভার শেষ পর্যন্ত কে বহন করবে।
অন্যদিকে, আদালতে মামলা দায়েরের কারণ এবং মামলাকারীর অবস্থান নিয়েও চলছে আলোচনা। তবে আইনি প্রক্রিয়া চলমান থাকায় মামলার অভিযোগ ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্যের ভিত্তিতেই বিষয়টির চূড়ান্ত মূল্যায়ন হওয়া উচিত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এখন নজর ৫ নভেম্বরের ২০২৬ শুনানিতে
বাংলাদেশ সোসাইটির নির্বাচন স্থগিতের ঘটনায় এখন সবার দৃষ্টি আগামী ৫ নভেম্বরের আদালত শুনানির দিকে। আদালতের পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে নির্বাচনের ভবিষ্যৎ।
নির্বাচন কমিশনের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য, মামলার অভিযোগের নিষ্পত্তি এবং ভোটার তালিকা ও সদস্যপদসংক্রান্ত প্রশ্নগুলোর সমাধান না হওয়া পর্যন্ত নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটছে না।
৩৫ হাজারের বেশি ভোটারের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল প্রবাসী বাংলাদেশিদের অন্যতম বৃহৎ এ সংগঠনের নির্বাচন। কিন্তু শেষ মুহূর্তে আদালতের স্থগিতাদেশে সেই প্রত্যাশা আপাতত থমকে গেছে।
প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটির প্রত্যাশা, আইনি জটিলতার দ্রুত নিষ্পত্তি, নির্বাচন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করে বাংলাদেশ সোসাইটির নির্বাচন যথাসময়ে সম্পন্ন করার কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে।



















