নিউইয়র্কে সংগঠক সাংবাদিক সাগর লোহানীর ওপর অতর্কিত হামলা, গ্রেপ্তার হামলাকারী: জ্যাকসন হাইটসের বাংলাদেশ স্ট্রিটে আড্ডা রেস্টুরেন্টে হামলার ঘটনা, উদ্দেশ্য নিয়ে উদ্বেগ ও তদন্তের দাবি
প্রজ্ঞা নিউজ ডেস্ক, নিউইয়র্ক:
নিউইয়র্কের বাংলাদেশি অধ্যুষিত জ্যাকসন হাইটসের বাংলাদেশ স্ট্রিটে অবস্থিত আড্ডা রেস্টুরেন্টে গত ২২ অক্টোবর, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সংগঠক ও সাংবাদিক সাগর লোহানীর ওপর অতর্কিত হামলার ঘটনা ঘটেছে। এ সময় তাঁর সঙ্গে থাকা অন্যরাও হামলাকারীর আক্রমণের শিকার হন। রেস্টুরেন্টের ক্রেতা ও কর্মীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় হামলাকারীকে আটক করা হয়। পরে ৯১১-এ ফোন পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে।
ঘটনাটি ঘিরে নিউইয়র্কের বাংলাদেশি কমিউনিটি, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক সংগঠক ও বিশিষ্টজনদের মধ্যে উদ্বেগ ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। হামলার প্রকৃত কারণ এবং এর পেছনে কোনো উদ্দেশ্য ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
ঘটনার বিবরণ দিলেন সাগর লোহানীর স্ত্রী
বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী যুক্তরাষ্ট্র সংসদের সভাপতি এবং হামলায় আহত সংগঠক ও সাংবাদিক সাগর লোহানীর স্ত্রী ক্ল্যারা রোজারিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরেছেন।
তিনি জানান, গত ২২ অক্টোবর বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় তিনি, সাগর লোহানী ও শহীদ ভাই জ্যাকসন হাইটসের বাংলাদেশ স্ট্রিটে অবস্থিত আড্ডা রেস্টুরেন্টে খাবার খাচ্ছিলেন। এ সময় তাঁদের সম্পূর্ণ অপরিচিত এক ব্যক্তি গীতিকার মেহফুজের সঙ্গে রেস্টুরেন্টে প্রবেশ করে সাগর লোহানীর সামনে এসে বর্ণবাদী মন্তব্য করতে থাকে এবং তাঁকে উত্তেজিত করার চেষ্টা করে।
ক্ল্যারা রোজারিওর ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁরা ওই ব্যক্তির কথায় কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে খাওয়ায় মনোযোগ দেন। ব্যক্তিটিকে মাদকাসক্ত মনে হওয়ায় তাঁরা তাঁর কথার উত্তর দিচ্ছিলেন না। একপর্যায়ে ওই ব্যক্তি হঠাৎ সাগর লোহানীকে ঘুষি মারতে উদ্যত হয়। সাগর হাত দিয়ে আঘাত প্রতিহত করে তাঁর দুই হাত চেপে ধরেন। এ সময় সাগর চিৎকার করে উঠলে হামলাকারী আরও উত্তেজিত হয়ে শহীদ ভাইকে লাথি ও ঘুষি মারতে থাকে।
এরপর হামলাকারী রেস্টুরেন্টের বাইরে চলে গেলেও আবার ফিরে এসে দ্বিতীয় দফায় আক্রমণ চালায়। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে রেস্টুরেন্টের অন্যান্য ক্রেতা ও কর্মীরা তাকে ধরে মাটিতে ফেলে আটক করেন এবং বাইরে বের করে দেন। এরই মধ্যে ক্ল্যারা রোজারিও ৯১১-এ ফোন করলে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে হামলাকারীকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায়।
হামলার উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন ক্ল্যারা রোজারিওর?
ঘটনাটি একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তির আকস্মিক আচরণ বলে মনে হলেও কয়েকটি বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ক্ল্যারা রোজারিও।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ঘটনার সময় রেস্টুরেন্টের প্রায় সব টেবিলেই অতিথি ছিলেন। কিন্তু হামলাকারী অন্য কাউকে লক্ষ্য না করে কেন সাগর লোহানীর টেবিলে এলেন? কেন তিনি সাগরকে তর্কে জড়ানোর চেষ্টা করলেন? রেস্টুরেন্টে উপস্থিত এত মানুষের মধ্যে কাউকে আঘাত না করে কেন সাগর ও তাঁর সঙ্গীদের ওপরই হামলা চালালেন?
এ ছাড়া ক্ল্যারা রোজারিওর সামনে হামলাকারী আক্রমণ চালালেও তাঁকে আঘাত করেনি বলে উল্লেখ করেছেন তিনি। এসব বিষয় তাঁর মনে সন্দেহের সৃষ্টি করেছে। তবে হামলার পেছনে কোনো পরিকল্পিত উদ্দেশ্য ছিল কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
ভিডিও ফুটেজ নিয়ে উদ্বেগ
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন ক্ল্যারা রোজারিও।
তিনি জানান, ফেসবুকে প্রচারিত ভিডিওতে হামলাকারীর আক্রমণের দৃশ্য দেখা যায়নি। ভিডিওটি যিনি প্রচার করেছেন, সেই আরমানি আসাদ তাঁর অপরিচিত বলেও উল্লেখ করেন ক্ল্যারা।
তিনি আরও জানান, আরমানি আসাদের ফেসবুক প্রোফাইল দেখে তাঁর সঙ্গে মিশিগানভিত্তিক American Muslim Political Action Committee (AMPAC)-এর সংশ্লিষ্টতার তথ্য দেখতে পান।
তবে হামলার সঙ্গে ওই সংগঠনের কোনো সম্পর্ক রয়েছে, এমন কোনো প্রমাণ বা নিশ্চিত তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ধরনের অনুমাননির্ভর প্রচারণা না চালিয়ে ঘটনার প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটনে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
কমিউনিটির বিশিষ্টজনদের নিন্দা ও প্রতিবাদ
সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠক সাগর লোহানীর ওপর হামলার ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী যুক্তরাষ্ট্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক কল্লোল দাশ, ডা: আজিজুল হক ( আজিজ ) , আশীষ রায়, বাবুল আচার্য্য, প্রগ্রেসিভ ফোরামের সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন বাচ্চু, প্রজ্ঞা পত্রিকার সম্পাদক উত্তম কুমার সাহা, নির্বাহী সম্পাদক মুনমুন সাহা, অনুপ ড্যান্স একাডেমির সভাপতি আলপনা গুহ এবং বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী ফ্রান্সের সভাপতি কিরণময় মণ্ডলসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।
তাঁরা বলেন, প্রবাসে একজন সংগঠক ও সাংবাদিকের ওপর এ ধরনের হামলা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যথাযথ তদন্ত করা প্রয়োজন। হামলার সঙ্গে যে বা যারাই জড়িত থাকুক, তাঁদের আইনের আওতায় এনে উপযুক্ত বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
নাট্যাভিনেতা ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব বশিরুল হক এ ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, মৌলবাদীরা এখানেও আমাদের ওপর আক্রমণ করছে। সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।
বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী যুক্তরাষ্ট্র সংসদের সহসাধারণ সম্পাদক লিলি মজুমদার ঘটনাটিকে অত্যন্ত দুঃখজনক উল্লেখ করে বলেন, সবচেয়ে বড় কথা, সবাই সুস্থ আছেন। তিনি ক্ল্যারা রোজারিওর সঙ্গে যোগাযোগ করে ঘটনার বিস্তারিত জানার আগ্রহ প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে হামলাটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কি না, তা তদন্তের দাবি জানান।
এছাড়া সংগঠক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ফটোগ্রাফার মিনহাজ আহমদ সাম্মু , উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর যুক্তরাষ্ট্র সংসদের সাংস্কৃতিক সম্পাদক সুলেখা পাল , সুপর্ণা সরকার রীমা, ফারজানা রুমা, সুমন দে সংসদের সাংগঠনিক সম্পাদক হিরো চৌধুরী, দিলীপ মোদক, সুপর্ণা শুভ্রা উর্মীও এ ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন।
এ ছাড়া নিউইয়র্কের বাংলাদেশি কমিউনিটির সাংবাদিক, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী, সাংস্কৃতিক কর্মী, শিক্ষক ও শিল্পীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিশিষ্টজনেরা এ ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়েছেন।
নিরপেক্ষ তদন্ত ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি
প্রবাসে বাঙালি কমিউনিটির সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, সাংবাদিকতা ও সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে সাগর লোহানীর ওপর হামলার ঘটনা।
হামলাকারী গ্রেপ্তার হলেও ঘটনার প্রকৃত কারণ, হামলার পেছনে কোনো পরিকল্পনা ছিল কি না এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত ভিডিওর বিষয়বস্তু নিয়ে বিস্তারিত তদন্তের দাবি উঠেছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ব্যক্তিগত বিরোধ, বর্ণবাদী আচরণ কিংবা অন্য কোনো উদ্দেশ্য—যে কারণেই এ হামলা ঘটে থাকুক না কেন, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করা জরুরি। একই সঙ্গে সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকর পদক্ষেপ কামনা করেছেন তাঁরা।
উল্লেখ্য, হামলার উদ্দেশ্য ও এর সঙ্গে অন্য কারও সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে এখনো কোনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। এসব বিষয়ে পুলিশের তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি হালনাগাদ করা হবে।



















