নামের বিড়ম্বনা : মোহাম্মদ আব্দুল আজিজ
প্রজ্ঞা নিউজ ডেস্ক:
মানুষের রয়েছে সুন্দর সুন্দর নাম। যেমন- শিমুল, পারুল, সুইটি, বিউটি ইত্যাদি। আগের দিনে মানুষের নাম ছিল সেকেলে। আধুনিকতার অভাবে, অশিক্ষা ও অজ্ঞতার কারণে মানুষের বাজে ও কুৎসিত নাম রাখা হতো। একটি সুদর্শন ছেলের বা রূপসী মেয়ের এরূপ নাম খুবই বেমানান ছিল। কিছু কুসংস্কারের কারণে উরুইন্যা, বিছুইন্যা, ঝাড়ু, ফালানি, পচা, বাসি, কালা ইত্যাদি বিদঘুটে নাম রাখা হতো। ধারণা করা হতো এরূপ নামের গুণে মানুষ দীর্ঘজীবী হয় এবং অকাল মৃত্যু থেকে রক্ষা পায়। কোন কুদৃষ্টি বা বালামুসিবত ধারে ঘেঁষে না। সমাজে এসব কুসংস্কার প্রচলিত ছিল। কিন্তু যাদের এ ধরনের নাম রাখা হতো তারা তাদের নামের অর্থ যখন বুঝতে পারতো তখন পূর্বসূরীদের ধিক্কার দেয়া ছাড়া আর কিছুই পারত না। এ ছাড়া মা-বাবার রাখা নাম ধর্মান্ধতার কারণে পরিবর্তনও করতে পারতো না। অনন্যোপায় হয়ে সারা জীবন তাকে সে নামটিই ধারণ করে চলতে হতো।
নাম নিয়ে অনেক মজার মজার মুখরোচক গল্প রয়েছে। কথিত আছে জনৈক ব্যক্তির নাম ছিল নাকি নিম্বর আলী। সে যখন রাস্তা দিয়ে যেত তখন দুষ্টু ছেলেরা আড়াল থেকে নিম! নিম! শব্দে প্রায়ই তাকে ক্ষ্যাপাত। তিনি অবশ্য একদিন দুষ্টুদের ধরে ভালো করে শিক্ষা দিয়েছিলেন। কিন্তু মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত নামের এ বিড়ম্বনা তাকে তাড়িয়ে বেড়াত। পেঁচকের স্বরে তাকে দেখলেই বন্ধু-বান্ধব নিম! নিম! ডেকে মজা কুড়াত। এজন্য বেচারা লাজে, অপমানে, ঘৃণায় তাদের ধারেকাছেও ভিড়ত না। কোকিলা নামের আরেক মেয়ের কথা বলি। কণ্ঠ যেন মুলি বাঁশ। জীবনে নাকি সে কোনদিনও গান গায়নি। অথচ তার নাম কোকিলা। প্রতিবেশি অনেকেই তাকে কোকলানি বা কোকিলনি বলে ডাকত। আবার কেউ কেউ কুহু কুহু স্বরে ব্যাঙ্গও করত। শোনা যায় বেচারা কোকিলের ন্যায় কালো ছিল বলে তার নাম রাখা হয়েছিল কোকিলা। আবার চোখে দেখে না, কানা ছেলে তার নামও পদ্মলোচন। নদ-নদী, গ্রহ-নক্ষত্রও মানুষের নাম। যেমন- চান-সুরুজ, চাঁদ-সূর্য, গঙ্গা, যমুনা ইত্যাদি। মানুষ হয়ে যায় গাছের পাখি। যেমন চড়ুই, বাবুই, পটুই(টুনটুনি), ময়না ইত্যাদি। গাছের ফলও বাদ যায়নি। আঙ্গুর, আপেল, ডালিম, বেদানা, আনার, আতা ইত্যাদি। রঙের নামেও মানুষের নাম প্রচলিত আছে। যেমন- লাল, নীল, ধলা, কালা ইত্যাদি। ফুল বা গাছের নামের মানুষের তো শেষ নেই। যেমন- কদম-কেয়া, শিমুল-জারুল-পলাশ, জুঁই-চামেলি-হেনা, শিউলি-শেফালি, মল্লিকা-মালতি, গোলাপ-বেলি-জবা, বকুল-পারুল ইত্যাদি। এরূপ হাজারো উদাহরণ রয়েছে যেগুলো বলার অপেক্ষা রাখে না।
মানুষের যত লম্বা বা বড় নামই থাকুক না কেন তার সুন্দর একটা ডাক নাম তো থাকবেই। কিন্তু এ সুন্দর ডাক নামকেও বন্ধু-বান্ধব, ঘনিষ্ঠজন অথবা হেয়ালী সম্প্রদায়ভুক্ত ব্যক্তিরা যেমন- দুলাভাই, তালতোভাই ইচ্ছা করে বা অনিচ্ছা সত্বেও ভুল করে অথবা রাগ করে অনেক সময় ব্যাঙ্গাত্বক রূপ দিয়ে থাকেন। যেমন পুরুষদের বেলায়- অসীম-অসীম্যা-অইসম্যা-অইস্যা, বকুল-বকুল্যা-বকল্যা, তুহিন-তুহিন্যা-তুইন্যা, মতলিব-মইতল্যা-মতলিব্যা-মতলইব্যা, মতি-মইত্যা-মুইত্যা, রফিক-রইফ্যা-রফিক্ক্যা, টিপু-টিপপোয়া, জাহির-জাইরা-জাহিরর্যা-জাওরা, দুলাল-দুলাইল্যা(আদর করে সংক্ষেপে দুলু), নানু-নাওন্না, শানু-শাওন্না, অপু- অওপ্পা, হাসিনা-হাসিনি-হাসিন্যা ইত্যাদি।
এবার আসা যাক মেয়েদের বেলায়। মেয়েরাও এর থেকে বাদ যায়নি। যেমন-মালেকা-মালেকী-মালেকনি, শেলি-শেইল্যানি, জলি-জইল্যানি, হাসি-হাইস্যানি, হাসু-হাউস্যা-হাউস্যানি, ডলি-ডইল্যানি এরূপ অজস্র উদাহরণ রয়েছে। আবার কেউ কেউ নামের আগে পিছে বিভিন্ন কুরুচিমূলক ব্যাঙ্গাত্বক শব্দ জুড়ে দিয়ে নামের অর্থ ও গুরুত্বকে বিকৃত করে ফেলেন। যেম-মোটা-মুটি, মোটকা-মোটকি, পেটলা-পেটলি, চিকনা-চিকনি, বাইট্টা- বাইট্টানি-বাটুনি, লম্বা-লাম্বি, বটলা-বটলি ইত্যাদি। এছাড়া আরো অনেক বিশ্রী বিশেষণ ঠাট্টাচ্ছলে বা ইচ্ছাকৃতভাবে সুনাম ক্ষুন্ন করার লক্ষ্যে নামের সাথে জুড়ে দেয়া হয়। যার ফলে বংশগত উপাধিটাও ধীরে ধীরে একদিন হারিয়ে যায়। আর এভাবেই নামকে বিকৃত করায় কেউ হাসির পাত্রে পরিনত হচ্ছে, কেউ মজা কুড়াচ্ছে, আবার কেউ লাজে ঘৃণায় এ থেকে পরিত্রাণ পাবার আশায় একাকীত্ব বেছে নিচ্ছে এমন উদাহরণও আমাদের সমাজে অবিরল নয়।
এ লেখার মাধ্যমে বিশেষ কাউকে আঘাত দেয়ার হীন উদ্দেশ্য আমার নয়। বরং সর্বমহলে গণসচেনতা বৃদ্ধি করাই আমার মূল লক্ষ্য। এভাবে যেন বন্ধু-বান্ধব বা হেয়ালী সম্পর্কীয় কেউ কারো নামকে বিকৃত বা ব্যাঙ্গ না করে যাতে ঐ ব্যক্তিটি বিড়ম্বিত হয় বা অস্বস্তিবোধ করে। তাতে তার জীবনের বিরাট ক্ষতিও হয়ে যেতে পারে। এখন অবশ্য সেকেলে নাম তেমন একটা রাখা হয় না বা শোনা যায় না। একালে অনেক সুন্দর সুন্দর নাম শোনা যায়। অবশ্য বাজারে এখন মানুষের সুন্দর নামকরণের অনেক সহায়ক বইও পাওয়া যাচ্ছে। যদি কেউ এরূপ নামের বিড়ম্বনায় পড়ে থাকেন তাহলে এসব নামকরণের বই দেখে নতুন নাম রেখে ফেলা উচিত বলে মনে করি।
তবে যে যাহাই বলুক, মানুষের সুন্দর বা কুৎসিত যে নামই হোক সেটা শুধু প্রত্যেকের একটি পরিচয় মাত্র। মানুষই তার নামকে জাগিয়ে তুলতে পারে তার স্বিয় কর্মের মাধ্যমে। অনেক বিশ্রী নামের মানুষও তার ভালো কর্মের গুণে মানুষের হৃদয়ে যুগ যুগ ধরে বেঁচে থাকে। তার গুনগ্রাহীর অভাব থাকে না। আবার অনেক সুন্দর নামের মানুষও তার খারাপ কর্মের জন্য চিরতরে হরিয়ে যায়। কেউ তার গুনগান করে না।
পরিশেষে পাঠক সমাজের কাছে আমি ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি এ জন্যে যে, উপরোক্ত উদাহরণের সাথে কারো নাম মিলে গেলে, এ লেখা পাঠে কেউ আঘাত বা কষ্ট পেয়ে থাকলে আমাকে ক্ষমা করবেন। অনিচ্ছা থাকা সত্বেও শুধু লেখার গুরুত্ব ও ভাবার্থকে ফুটিয়ে তোলার জন্যেই উক্ত নামগুলো ব্যবহার করতে হয়েছে। সর্বমহলে সামান্যতম সচেতনতা সৃস্টি হলেই আমার এ লেখা স্বার্থক হবে বলে মনে করি। ডাক নামের সাথে বিকৃত বা ব্যাঙ্গাত্বক শব্দ নয় বা নামকে বিকৃত করা নয়। মানুষের নাম সুন্দর। মানুষ সুন্দরের পূজারী। তাই সুন্দরকে সুন্দর রাখাই উচিত। ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় কাউকে নামের বিড়ম্বনায় ফেলা উচিত নয় (নিউ ইয়র্ক)।
তথ্য সূত্র: শিরোনাম: নামের বিড়ম্বনা, কলমে: আজীজ আহমেদ। প্রকাশকাল: ১২ই ফেব্রুয়ারি ২০০১খ্রি: সোমবার, হইচই, পৃষ্ঠা-৫, দৈনিক বাংলাবাজার পত্রিকা। উল্লেখ্য, ‘আজীজ আহমেদ’ উক্ত প্রবন্ধের রচয়িতা কবি, লেখক, ছড়াকার ও গীতিকার ‘মোহাম্মদ আব্দুল আজিজ’-এর বাংলাদেশে সাহিত্যাঙ্গনে ব্যবহৃত লেখালেখির পেন নেম বা ছদ্মনাম যিনি নিউ ইয়র্ক তথা আমেরিকার বাংলা সাহিত্যাঙ্গনে ‘আব্দুল আজিজ’ নামেও পরিচিত।


















