Logo

আন্তর্জাতিক    >>   বাংলাদেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহাল: কার কি লাভ?

বাংলাদেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহাল: কার কি লাভ?

বাংলাদেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহাল: কার কি লাভ?

দীপক কুমার আচার্য, প্রজ্ঞা নিউজ ডেস্ক:
আজ ২০ নভেম্বর  বহুল আলোচিত নির্বাচনকালীন নির্দলীয়তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহাল করে রায় দিয়েছেন সর্বোচ্চআদালত। প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বে সাতসদস্যের আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ ওই রায়ের বিরুদ্ধে করা দুটিপৃথক সিভিল আপিল মঞ্জুর ও চারটি রিভিউ আবেদন নিষ্পত্তি করেসর্বসম্মত হয়ে আজ বৃহস্পতিবার এই রায় দেন। তবে এটি কার্যকর হবেআগামী চতুর্দশ সংসদ নির্বাচন থেকে।
সংক্ষিপ্ত রায়ে বলা হয়, গত ১৪ বছর আগে সাবেক প্রধান বিচারপতি এবি এম খায়রুল হকের নেতৃত্বে আপিল বিভাগের সংবিধানের ত্রয়োদশসংশোধনী বাতিলের পুরো রায়কে ত্রুটিপূর্ণ ও কলঙ্কিত উল্লেখ করে তাসম্পূর্ণ বাতিল করা হয়।
রায়ে আরও বলা হয়েছে, এর মধ্য দিয়ে সংবিধানে স্বয়ংক্রিয়ভাবেতত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালু হলো। তবে আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদনির্বাচন অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনেই হবে। কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা কার্যকর হবে আগামী চতুর্দশ সংসদ নির্বাচন থেকে।
এ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহাল করে আসলে কার কি লাভহয়েছে তা নিয়ে আলোকাপাত কর যাক। এর আগে দেখা যাক, বাংলাদেশের পাশের দেশগুলোতে এ ধরনের ব্যবস্থা রয়েছে কী না বাকোন কোন দেশে রয়েছে। প্রথম ধরা যাক, পৃথিবীর বৃহত্তম গণতান্ত্রিকদেশ ভারতের কথা। ভারতের সংবিধানে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়কসরকার ব্যবস্থার কোনো সুনির্দিষ্ট বা স্বতন্ত্র বিধান নেই। ভারতেনির্বাচনকালীন সরকারের বিষয়টি সাধারণত বিদ্যমান ওয়েস্টমিনস্টারপদ্ধতির সংসদীয় রীতিনীতি এবং প্রচলিত প্রথার ওপর ভিত্তি করেপরিচালিত হয়।
ভারতে নির্বাচনকালীন সরকারের প্রথা অনুযায়ী, ক্ষমতাসীন সরকারইদায়িত্ব পালন করে: সাধারণ নির্বাচনের সময়, প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীনক্ষমতাসীন সরকারই ক্ষমতা হস্তান্তর না হওয়া পর্যন্ত 'তত্ত্বাবধায়ক' বা'অন্তর্বর্তী সরকার' হিসেবে তাদের দায়িত্ব পালন চালিয়ে যায়। যদিওতারা আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমতায় থাকে, কিন্তু প্রথাগতভাবে তাদেরকার্যক্রম দৈনন্দিন প্রশাসনিক ও রুটিন কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়।এই সময়ে তারা কোনো বড় নীতি নির্ধারণী সিদ্ধান্ত নেওয়া বা নতুনপ্রকল্প ঘোষণা করা থেকে বিরত থাকে, যাতে নির্বাচনের ফলাফলে কোনোপ্রভাব না পড়ে।
ভারতের নির্বাচন কমিশন একটি সাংবিধানিক ও স্বাধীন সংস্থা।নির্বাচনের সময় কমিশন আদর্শ আচরণবিধি কার্যকর করে এবংনির্বাচন প্রক্রিয়া সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে পরিচালনার জন্য প্রশাসনেরওপর ব্যাপক ক্ষমতা প্রয়োগ করে।
শ্রীলঙ্কার সংবিধান ও রাজনৈতিক ব্যবস্থায় বাংলাদেশের বা পাকিস্তানেরমতো আনুষ্ঠানিক, সাংবিধানিকভাবে সংজ্ঞায়িত তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার কোনো বিধান নেই। শ্রীলঙ্কাও ভারতের মতোই ওয়েস্টমিনস্টার পদ্ধতির সংসদীয় সরকার এবং একটি শক্তিশালী নির্বাহী রাষ্ট্রপতিব্যবস্থা অনুসরণ করে।
নেপালের সংবিধান ভারত ও পাকিস্তানের ব্যবস্থার মাঝামাঝি একটিপথ অনুসরণ করে, তবে এখানে নির্বাচনকালীন সরকারের কোনোস্বতন্ত্র, অরাজনৈতিক কাঠামো নেই। বরং, এটি একটি অন্তর্বর্তী সরকারহিসাবে কাজ করে। নেপালের সংবিধানে, সংসদের মেয়াদ শেষ হলে বাসরকার ভেঙে গেলে, বিদ্যমান সরকারই তার ক্ষমতা চালিয়ে যায়, তবেতা অন্তর্বর্তী সরকার হিসেবে।
এদিকে, ভুটানের ক্ষেত্রে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাটিসাংবিধানিকভাবেই সুনির্দিষ্ট কাঠামো লাভ করেছে, যা এটিকে এইঅঞ্চলের অন্যান্য দেশের তুলনায় কিছুটা আলাদা করেছে। ভুটানেরসংবিধানের অনুচ্ছেদ ২০, ধারা ৪ অনুযায়ী, জাতীয় পরিষদ-এর মেয়াদশেষ হলে বা ভেঙে দেওয়া হলে, একটি অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসন গঠিতহয়।
অপরদিকে, পাকিস্তানের তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাটি সংবিধান দ্বারাসুরক্ষিত একটি প্রক্রিয়া, যা নির্বাচনকালীন সময়ে একটি নিরপেক্ষঅন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসন নিশ্চিত করার জন্য বিশেষভাবে তৈরি করাহয়েছে।
পাকিস্তানের সংবিধান অনুযায়ী, সংসদ বা প্রাদেশিক পরিষদের মেয়াদশেষ হলে বা ভেঙে দেওয়া হলে একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়।বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী এবং বিরোধীদলীয় নেতা-কে আলাপ-আলোচনারমাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রীর জন্য একটি নামে ঐকমত্যে পৌঁছাতেহয়। ঐকমত্যে পৌঁছানো গেলে, রাষ্ট্রপতি সেই ব্যক্তিকে তত্ত্বাবধায়কপ্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ করেন। যদি প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয়নেতা কোনো নামে একমত হতে না পারেন, তবে বিষয়টি নির্বাচনকমিশনে  পাঠানো হয়। নির্বাচন কমিশন তখন ঐকমত্যের জন্যপ্রস্তাবিত ব্যক্তিদের তালিকা থেকে একজনকে তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রীহিসেবে নিয়োগ করে। প্রাদেশিক পর্যায়েও (মুখ্যমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয়নেতা) একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়।
এখন দেখা যাক, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য সরকার ব্যবস্থায় কি বলা আছে।যুক্তরাজ্যের আইনে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বলতে বাংলাদেশের বাপাকিস্তানের মতো সংবিধান-স্বীকৃত কোনো আনুষ্ঠানিক কাঠামো নেই।যুক্তরাজ্য একটি ওয়েস্টমিনস্টার পদ্ধতির সংসদীয় গণতন্ত্র অনুসরণকরে। এখানে সাধারণ নির্বাচনের সময়, সরকার যে পদ্ধতিতেপরিচালিত হয়, তা আইন দ্বারা নয়, বরং প্রথা ও ম্যানুয়াল দ্বারানির্ধারিত হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের শাসনতান্ত্রিক কাঠামোতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বা এই ধরনেরকোনো ধারণা বিদ্যমান নেই এবং এর আইনেই এই বিষয়ে কিছু বলাহয়নি। এর মূল কারণ হলো যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান একটিপ্রেসিডেন্ট-শাসিত সরকার ব্যবস্থা অনুসরণ করে, যা সংসদীয় ব্যবস্থার(যেমন বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ভারত) থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন।
যেসব দেশে তাদের সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা রয়েছেস্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে এসব দেশে গণতন্ত্র কতটা মজবুত অথবারাজনৈতিকভাবে কতটা স্থিতিশীল। পাকিস্তান ও নেপালের গণতান্ত্রিকঅবস্থা এখন কেমন আমরা তা সহজেই  দেখতে পাচ্ছি। তাহলেবাংলাদেশই কি এখন এসব দেশের কাতারেই হাটছে? বুঝলাম সংবিধানেতত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা থাকলে ক্ষমতা শেষে একটি নিরপেক্ষনির্বাচন ও একটি ভালমানের সরকার ক্ষমতায় আসবে। আসলে কিঅতীকে কখনও তা হয়েছে বা হবে? যদি না হয় তাহলে কাকে খুশি করারজন্য এসব ব্যবস্থা করা হয়েছে, বিশেষ কোন দেশকে খুশি করার জন্যএমন প্র্রশ্ন আসতেই পারে। 
বাংলাদেশে বিএনপি সরকারের সময়ে ১৯৯৬ সালে জাতীয় সংসদেসংবিধানে ত্রয়োদশ সংশোধনী তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রবর্তনহয়েছিল। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এম সলিমউল্লাহসহ অন্যরা এরবৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ১৯৯৮ সালে হাইকোর্ট বিভাগে একটি রিট আবেদনদাখিল করা হয়। পরবর্তীতে ২০০৪ সালের ৪ আগস্ট হাইকোর্টের বিশেষবেঞ্চ ওই রিট খারিজ করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বৈধ ঘোষণাকরেন। অর্থাৎ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বহাল থাকে। এর বিরুদ্ধে রিটআবেদনকারী পক্ষ ২০০৫ সালে আপিল দাখিল করেন।
২০১১ সালের ১০ মে প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হকের নেতৃত্বেআপিল বিভাগের সাত সদস্যের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতেরভিত্তিতে ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল ঘোষণা করে সংক্ষিপ্ত রায় দেন।পরবর্তীতে প্রায় ১৬ মাস পর ২০১২ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর পূর্ণাঙ্গ রায়প্রকাশিত হয়। সেখানে সংক্ষিপ্ত আদেশের পর তত্ত্বাবধায়কসরকারব্যবস্থা বাতিল এবং সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমেসংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বিধানসমূহ বাদ দেওয়াহয়। ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বিলোপ ঘটে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর সুশাসনের জন্যনাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারসহ পাঁচজন, বিএনপি-জামায়াতসহ একাধিক রাজনৈতিক দল ওই রায়ের পুনর্বিবেচনাচেয়ে আপিল বিভাগে আবেদন দাখিল করেন। পাশাপাশি নওগাঁররাণীনগরের নারায়ণপাড়া এলাকার বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. মোফাজ্জলহোসেনও গত বছর একটি রিভিউ আবেদন করেন।
এ আবেদনের শুনানি শেষে গত ২৭ আগস্ট আপিলের অনুমতি দেন।পরবর্তীতে ১০ কার্যদিবস এ আপিলের ওপর বিস্তারিত শুনানি অনুষ্ঠিতহয়। শুনানি শেষে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বেসাত সদস্যের বেঞ্চ গত ১১ নভেম্বর রায় ঘোষণার জন্য ২০ নভেম্বর দিনধার্য করেন। তারই ধারাবাহিকতায় গতকাল তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাসংক্রান্ত সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের রায়ের বিরুদ্ধেআপিল ও রিভিউ মঞ্জুর করে সর্বসম্মত রায় সংক্ষিপ্ত রায় দেন।
বাংলাদেশে একসময় নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালু ছিল, যা১৯৯৬ সালের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয়।পরে ২০১১ সালে এটিকে বাতিল করা হলেও বর্তমানে আবার এটিপুনর্বহাল হয়েছে। এই ব্যবস্থাটির উদ্দেশ্য ছিল নির্বাচনকালীন সময়েএকটি সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক নিরপেক্ষ প্রশাসন নিশ্চিত করা। আসলেকি তা কখনও হয়েছে নাকি কখনও হবে? এব্যাপারে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। 
 লেখক: দি সাউথ এশিয়ান টাইমস্ পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক।