১৬তম ব্রুকলিন পথমেলায় বাঙালি সংস্কৃতির জয়গান—লিটল বাংলাদেশে হাজারো মানুষের মিলনমেলা, প্রবাসে একদিনের জন্য ফিরে এলো বাংলাদেশের প্রাণ
প্রজ্ঞা নিউজ ডেস্ক :
নিউইয়র্কের ব্রুকলিনের চার্চ অ্যাভিনিউ যেন একদিনের জন্য রূপ নেয় ছোট্ট এক বাংলাদেশে। বর্ণিল সাজ, দেশীয় পোশাক, ঐতিহ্যবাহী খাবারের সুবাস, লোকজ সংস্কৃতির আবহ আর হাজারো প্রবাসী বাংলাদেশির মিলনমেলায় মুখর হয়ে ওঠে ‘লিটল বাংলাদেশ’ এলাকা। চার্চ-ম্যাকডোনাল্ড বাংলাদেশি বিজনেস অ্যাসোসিয়েশন (সিএমবিবিএ)-এর উদ্যোগে অনুষ্ঠিত ১৬তম ব্রুকলিন পথমেলা পরিণত হয় প্রবাসে বাঙালির ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সম্প্রীতির এক অনন্য উৎসবে।
গত ৬ জুন ২০২৬ শনিবার দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত চলা এই আয়োজনে নিউইয়র্কসহ যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য থেকে কয়েক হাজার বাংলাদেশি অংশ নেন। পরিবার-পরিজন, বন্ধু-বান্ধব ও স্বজনদের নিয়ে মেলায় আসা দর্শনার্থীদের পদচারণায় পুরো এলাকা ছিল প্রাণচঞ্চল। অনেকের কাছে এটি ছিল দীর্ঘদিন পর প্রিয়জনদের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ, আবার নতুন প্রজন্মের কাছে ছিল শেকড়কে নতুনভাবে আবিষ্কারের এক অনন্য উপলক্ষ।
মেলার উদ্বোধন করেন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও সমাজসেবক হাজী আব্দুল কাদের মিয়া। প্রধান অতিথি ছিলেন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ফজলুল কাদের। সভাপতিত্ব করেন আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল বার অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক ও ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ডিস্ট্রিক্ট লিডার অ্যাটর্নি মঈন চৌধুরী। এছাড়া বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ সোসাইটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ফখরুল আলম, বাংলাদেশ সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী ফিরোজ আহমেদ, ব্যবসায়ী মো. জাফরউল্লাহ, ইঞ্জিনিয়ার ফজলুল কাদের, কমিউনিটি লিডার কাজী আজমসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। অনুষ্ঠানে কনভেনার মামুন উর রশীদ ও চিফ কো-অর্ডিনেটর আবুল এম মহিউদ্দিনের নেতৃত্বে আয়োজক কমিটির সদস্যরা সার্বিক তত্ত্বাবধান করেন।
মেলা উপলক্ষে পাঠানো শুভেচ্ছা বার্তায় নিউইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানি বলেন, বহুজাতিক নিউইয়র্ক নগরীর অর্থনীতি ও সংস্কৃতিতে বাংলাদেশি-আমেরিকানদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বাঙালি কমিউনিটির সাংস্কৃতিক চর্চা ও সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষার ভূয়সী প্রশংসা করেন। অপরদিকে নিউইয়র্ক সিটি কাউন্সিল সদস্য শাহানা হানিফ বলেন, এ ধরনের আয়োজন নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি পৌঁছে দেওয়ার কার্যকর মাধ্যম।
উদ্বোধনী বক্তব্যে হাজী আব্দুল কাদের মিয়া বলেন, প্রবাসে বেড়ে ওঠা শিশু-কিশোরদের বাংলাদেশি সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া এবং কমিউনিটির মধ্যে ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ববোধ আরও সুদৃঢ় করাই এই পথমেলার মূল লক্ষ্য। তাঁর ভাষায়, “ব্রুকলিন পথমেলা শুধু একটি উৎসব নয়, এটি আমাদের শেকড়, পরিচয় ও আত্মপরিচয়ের প্রতীক।”
মেলাজুড়ে ছিল দেশীয় পোশাক, শাড়ি, থ্রি-পিস, পাঞ্জাবি, গয়না, হস্তশিল্প, প্রসাধনী ও বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের আকর্ষণীয় স্টল। প্রবাসীরা ঈদ, পারিবারিক অনুষ্ঠান ও ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য দেশীয় পণ্য কেনাকাটায় ব্যাপক আগ্রহ দেখান। একই সঙ্গে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের জন্য এটি ছিল নিজেদের পণ্য ও সেবা প্রদর্শনের বড় একটি প্ল্যাটফর্ম।
খাবারের অংশে ছিল দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড়। ফুচকা, চটপটি, ঝালমুড়ি, কাবাব, পিঠাপুলি, ভর্তা, আম ও বরইয়ের আচারসহ বাংলাদেশি ঐতিহ্যবাহী নানা খাবারের স্টলে সারাদিনই ছিল উৎসবমুখর পরিবেশ। অনেকেই বলেন, প্রবাসে থেকেও এই মেলার মাধ্যমে তারা দেশের স্বাদ, গন্ধ ও আবেগকে নতুন করে অনুভব করার সুযোগ পান।
শিশু-কিশোরদের জন্য বিশেষভাবে আয়োজন করা হয় খেলাধুলা, রাইড, কবিতা আবৃত্তি, নৃত্য ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা। নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণে মঞ্চ হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত, যা দর্শকদের ব্যাপকভাবে মুগ্ধ করে। আয়োজকদের মতে, আগামী দিনের বাংলাদেশি-আমেরিকান প্রজন্মের মধ্যে ভাষা ও সংস্কৃতির চর্চা জাগিয়ে তুলতে এসব উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় জমকালো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। বাংলাদেশের জনপ্রিয় শিল্পী শুভ্র দেব, বিন্দু কণা, শামীম সিদ্দিকী ও কামরুজ্জামান বকুলসহ খ্যাতিমান শিল্পীদের পরিবেশনায় মঞ্চে সৃষ্টি হয় এক মনোমুগ্ধকর আবহ। দর্শনার্থীরা গান, সঙ্গীত ও বিনোদনের মধ্য দিয়ে উপভোগ করেন এক স্মরণীয় সন্ধ্যা।
কমিউনিটি সেবায় বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ নার্গিস আহমেদ, মো. কাদের মিয়া ও ফজলুল কাদেরসহ কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তিকে সম্মাননা ক্রেস্ট প্রদান করা হয়। একই সঙ্গে সংগঠনের সাবেক সভাপতি মহিউদ্দিন হাসানকে প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে নিরলস অবদানের জন্য বিশেষ সম্মাননা জানানো হয়। অনুষ্ঠানে সংগঠনের প্রয়াত নেতৃবৃন্দ আব্দুর রব, অধ্যাপক সরোয়ার বি. সালাম, ওবায়দুল হক, মিনহাজউদ্দিন বাবর, বেলায়েত হোসেন, মহিউদ্দিন মাহমুদ দুলাল, কামাল আহমেদ ও আবুল হোসেনের স্মৃতির প্রতিও গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়।
এ উপলক্ষে প্রকাশিত হয় দৃষ্টিনন্দন স্মরণিকা ‘সওদাগর’, যার মোড়ক উন্মোচন করেন কমিউনিটি নেতৃবৃন্দ। এতে ব্রুকলিনের বাংলাদেশি কমিউনিটির ইতিহাস, সংগ্রাম, সাফল্য ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার নানা দিক তুলে ধরা হয়েছে।
দিনের অন্যতম আকর্ষণ ছিল র্যাফেল ড্র। প্রথম পুরস্কার হিসেবে একটি গাড়ি প্রদান করা হয়, যা দর্শনার্থীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ ও উচ্ছ্বাস সৃষ্টি করে। বিজয়ীর নাম ঘোষণার মধ্য দিয়ে আনন্দঘন পরিবেশে শেষ হয় ১৬তম ব্রুকলিন পথমেলার আনুষ্ঠানিকতা।
আয়োজকরা জানান, প্রতিবছরই অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ও মেলার পরিধি বাড়ছে। ভবিষ্যতে আরও বৃহৎ পরিসরে আন্তর্জাতিক মানের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ব্যবসায়িক প্রদর্শনী, তরুণ উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ এবং বাংলা ভাষা ও ঐতিহ্যভিত্তিক নতুন নতুন কর্মসূচি যুক্ত করে ব্রুকলিন পথমেলাকে বিশ্বব্যাপী প্রবাসী বাংলাদেশিদের অন্যতম প্রধান সাংস্কৃতিক উৎসবে পরিণত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
১৬তম ব্রুকলিন পথমেলা আবারও প্রমাণ করেছে—ভৌগোলিক দূরত্ব যতই হোক না কেন, বাঙালির সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, ভাষা ও শেকড়ের টান কখনো মুছে যায় না। প্রবাসের মাটিতে এই আয়োজন শুধু বিনোদনের নয়, বরং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বাংলাদেশের ইতিহাস, কৃষ্টি ও পরিচয় বহন করে নিয়ে যাওয়ার এক শক্তিশালী সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন।



















