Logo

আন্তর্জাতিক    >>   যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তিকে ইরান কেন বিজয় হিসেবে দেখছে?

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তিকে ইরান কেন বিজয় হিসেবে দেখছে?

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তিকে ইরান কেন বিজয় হিসেবে দেখছে?

প্রজ্ঞা নিউজ ডেস্ক:

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) ঘিরে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে ইরান। একদিকে সরকার এটিকে কূটনৈতিক সাফল্য ও প্রতিরোধের বিজয় হিসেবে তুলে ধরছে, অন্যদিকে দেশের ভেতরে ও বাইরে অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন—এটি সত্যিই বিজয়, নাকি দীর্ঘ যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক সংকটের চাপে বাধ্য হয়ে নেওয়া একটি সমঝোতা?

ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব চুক্তিটিকে ইতিবাচকভাবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান একে ‘সম্ভাব্য রূপান্তরকারী’ উদ্যোগ হিসেবে বর্ণনা করে বলেছেন, এটি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে ইরানের বহু অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান হতে পারে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন বাস্তবতা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।

অন্যদিকে পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাগের গালিবাফ এই সমঝোতাকে ‘চূড়ান্ত বিজয়ের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। বিশ্লেষকদের মতে, গালিবাফের মতো প্রভাবশালী ব্যক্তির প্রকাশ্য সমর্থন ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ইরানের ক্ষমতাকাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ, এমনকি ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডসের (আইআরজিসি) ভেতরেও এই চুক্তির প্রতি সমর্থন রয়েছে।

 ‘বিজয়’ বর্ণনার পেছনে তেহরানের যুক্তি

ইরানি নেতৃত্বের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তাদের মূল লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। তাদের মতে, সামরিক ও রাজনৈতিক চাপ সত্ত্বেও ইরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা যায়নি, ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে ক্ষমতা থেকে সরানো সম্ভব হয়নি এবং পারমাণবিক কর্মসূচিও পুরোপুরি বন্ধ করা যায়নি।

তেহরানের ভাষ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ ও চাপের মধ্যেও ইরান আলোচনার টেবিলে অবস্থান ধরে রেখেছে এবং নিষেধাজ্ঞা শিথিলের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখনো আলোচনায় রয়েছে। ফলে তারা এটিকে পরাজয় নয়, বরং প্রতিরোধের ফলাফল হিসেবেই দেখাতে চাইছে।

ভেতরে ভেতরে বাড়ছে সমালোচনা

তবে সরকারের এই অবস্থান সবাই মেনে নিচ্ছে না। ইরানের কট্টরপন্থি রাজনৈতিক শিবিরের একটি অংশ সমঝোতার বিরোধিতা করছে। পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির এক শীর্ষ সদস্য খসড়া চুক্তিকে এমন একটি নথি বলে অভিহিত করেছেন, যা ইরানকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘উপনিবেশে’ পরিণত করতে পারে।

গত কয়েক মাস ধরে কট্টরপন্থি রাজনীতিক, রাষ্ট্র-সমর্থিত গণমাধ্যম এবং বিভিন্ন সরকারপন্থি সমাবেশে বারবার বলা হয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বাস করা যায় না। তাদের অভিযোগ, অতীতে কূটনৈতিক আলোচনা চলাকালেই ওয়াশিংটন ও ইসরায়েল সামরিক প্রস্তুতি জোরদার করেছে।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে এসব সমালোচনামূলক কণ্ঠ কিছুটা নীরব হয়ে গেছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এটি ইঙ্গিত দেয় যে চুক্তি এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে অনুমোদন পেয়েছে।

অর্থনৈতিক বাস্তবতা বড় চাপ

বিশ্লেষকদের মতে, কেবল রাজনৈতিক হিসাব নয়, অর্থনৈতিক বাস্তবতাও ইরানকে সমঝোতার পথে হাঁটতে বাধ্য করেছে। দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা, যুদ্ধের ক্ষতি, তেল রপ্তানিতে বাধা, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে উঠেছে।

অনেক ইরানির কাছে তাই প্রশ্নটি রাজনৈতিক নয়, বরং অর্থনৈতিক। তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই চুক্তির ফলে দ্রব্যমূল্য কমবে কি না, অর্থনীতি স্বস্তি পাবে কি না এবং নতুন করে যুদ্ধের ঝুঁকি কমবে কি না।

যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স জানিয়েছেন, ইরান সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের করদাতাদের অর্থ পাবে না। তবে যদি তেহরান চুক্তির শর্ত পূরণ করে এবং নিষেধাজ্ঞা শিথিল হয়, তাহলে দেশটি বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের সম্পদ ও অর্থনৈতিক সুযোগের প্রবেশাধিকার পেতে পারে।

কঠিন আলোচনা এখনো বাকি

যদিও দুই পক্ষই ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে, তবু চুক্তির অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখনো অমীমাংসিত। ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ভবিষ্যৎ, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অনুমোদিত মাত্রা, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা এবং লেবানন ইস্যু নিয়ে এখনও বিস্তারিত আলোচনা বাকি রয়েছে।

আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে নতুন দফা আলোচনা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। সেই বৈঠককে সমঝোতার ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ইসরায়েল ফ্যাক্টর

চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তার একটি হলো ইসরায়েল। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, প্রয়োজন মনে করলে দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি সেনা উপস্থিতি অব্যাহত থাকবে।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে লেবাননে ইসরায়েলি সামরিক কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেছেন এবং বৈরুতে সাম্প্রতিক হামলা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। যদিও তিনি নেতানিয়াহুর সঙ্গে নিজের সম্পর্ককে ‘চমৎকার’ বলেই উল্লেখ করেছেন।

পর্যবেক্ষকদের মতে, ওয়াশিংটন ও তেলআবিবের এই দৃশ্যমান মতপার্থক্য আপাতত ইরানের জন্য কূটনৈতিক সুবিধা তৈরি করলেও, একই সঙ্গে সমঝোতাকে আরও ভঙ্গুর করে তুলছে।

সাধারণ ইরানিরা কী ভাবছেন?

বিবিসি পার্সিয়ানের পাঠক-দর্শকদের প্রতিক্রিয়ায় দেখা গেছে, সরকারের ‘বিজয়ের’ বর্ণনা সবার কাছে সমানভাবে গ্রহণযোগ্য হয়নি। কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন, চুক্তি হলেও ভবিষ্যতে আবার সংঘাত শুরু হতে পারে। আবার অনেক সরকারবিরোধী ইরানি মনে করছেন, রাজনৈতিক পরিবর্তন ছাড়া এই সমঝোতা জনগণের কাঙ্ক্ষিত ফল বয়ে আনবে না।

তবে অন্য একটি অংশ চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছে। তাদের মতে, যুদ্ধের ঝুঁকি কমানো, অর্থনীতিকে কিছুটা স্বস্তি দেওয়া এবং সাধারণ মানুষকে স্বাভাবিক জীবনে ফেরানোর জন্য এই সমঝোতা প্রয়োজন ছিল।

সাফল্যের প্রকৃত পরীক্ষা

বিশ্লেষকদের মতে, ইরান সরকার যতই এটিকে ‘বিজয়’ হিসেবে উপস্থাপন করুক না কেন, শেষ পর্যন্ত এর সাফল্য নির্ধারিত হবে বাস্তব ফলাফলের ওপর। যুদ্ধের আশঙ্কা কমে কি না, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসে কি না, নিষেধাজ্ঞা শিথিল হয় কি না এবং দেশটি নতুন করে সংকটে না জড়িয়ে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে পারে কি না—সেই উত্তরই নির্ধারণ করবে এই সমঝোতার প্রকৃত মূল্য। সূত্র: বিবিসি