Logo

সাহিত্য সংস্কৃতি    >>   সুস্থ সমাজ গড়তে নারীর ভূমিকা অপরিসীম গুরুত্বপূর্ণ

সুস্থ সমাজ গড়তে নারীর ভূমিকা অপরিসীম গুরুত্বপূর্ণ

সুস্থ সমাজ গড়তে নারীর ভূমিকা অপরিসীম গুরুত্বপূর্ণ

সুলেখা পাল:
সভ্যতার ইতিহাসে প্রতিটি উন্নত সমাজের পেছনে রয়েছে নারীর নীরব অথচ শক্তিশালী অবদান। পৃথিবীর কোনো জাতি, কোনো রাষ্ট্র কিংবা কোনো সভ্যতা শুধু পুরুষের একক প্রচেষ্টায় বিকশিত হয়নি; বরং নারী ও পুরুষের সম্মিলিত প্রজ্ঞা, শ্রম, ত্যাগ এবং সৃজনশীলতাই মানবসভ্যতাকে এগিয়ে নিয়েছে। তাই একটি সুস্থ, মানবিক ও কল্যাণমুখী সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে নারীর ভূমিকা কেবল গুরুত্বপূর্ণ নয়, অপরিহার্য।
সমাজের ক্ষুদ্রতম একক হলো পরিবার। আর পরিবারের প্রাণকেন্দ্র হচ্ছেন একজন নারী। একজন মায়ের স্নেহ, একজন শিক্ষিকার প্রেরণা, একজন কন্যার স্বপ্ন, একজন সহধর্মিণীর সহযোগিতা এবং একজন কর্মজীবী নারীর আত্মনিবেদন—এসব মিলেই গড়ে ওঠে একটি সুস্থ পরিবার। সেই পরিবার থেকেই জন্ম নেয় আদর্শ নাগরিক, যারা ভবিষ্যতে রাষ্ট্র ও সমাজের নেতৃত্ব দেয়। তাই নারীকে অবমূল্যায়ন করা মানে একটি জাতির ভবিষ্যৎকে দুর্বল করে দেওয়া।
আজকের বিশ্বে নারীরা আর শুধু গৃহের চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ নন। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, চিকিৎসা, শিক্ষা, কৃষি, শিল্প, ব্যবসা, প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, গণমাধ্যম, সংস্কৃতি ও রাজনীতিসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে তারা অসামান্য দক্ষতা ও নেতৃত্বের পরিচয় দিচ্ছেন। বাংলাদেশও এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। গ্রামীণ জনপদ থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক অঙ্গন পর্যন্ত বাংলাদেশের নারীরা তাঁদের মেধা, সততা, পরিশ্রম ও আত্মবিশ্বাসের মাধ্যমে দেশের মর্যাদা বৃদ্ধি করছেন। তৈরি পোশাক শিল্পে লাখো নারীর শ্রম যেমন দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করেছে, তেমনি উদ্যোক্তা, গবেষক, কূটনীতিক ও প্রশাসক হিসেবে নারীর সাফল্য উন্নয়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
কিন্তু এই অগ্রগতির পাশাপাশি একটি কঠিন বাস্তবতাও আমাদের সামনে বিদ্যমান। আজও বহু নারী বৈষম্য, সহিংসতা, বাল্যবিবাহ, যৌতুক, কর্মক্ষেত্রে হয়রানি, সামাজিক কুসংস্কার এবং নিরাপত্তাহীনতার শিকার হন। এসব প্রতিবন্ধকতা শুধু নারীর অগ্রগতির পথ রুদ্ধ করে না; বরং একটি জাতির সামগ্রিক উন্নয়নকেও ব্যাহত করে। কারণ নারীর সম্ভাবনাকে অবদমিত করা মানে দেশের অর্ধেক মানবসম্পদকে অকার্যকর করে রাখা।
একটি সুস্থ সমাজ কেবল আইন প্রণয়নের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় না; এটি গড়ে ওঠে মূল্যবোধ, নৈতিকতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের ভিত্তির ওপর। আর এই মূল্যবোধের প্রথম পাঠশালা হলো পরিবার। শিশুর চরিত্র, মানবিকতা, সহমর্মিতা, শৃঙ্খলা ও দেশপ্রেমের বীজ রোপণ করেন একজন মা। ফলে একজন শিক্ষিত, সচেতন ও মূল্যবোধসম্পন্ন নারী একটি প্রজন্মকে আলোকিত করতে পারেন।
নারীর ক্ষমতায়ন কোনো দান নয়, এটি একটি মৌলিক অধিকার। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, সম্পত্তির অধিকার, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব। নারীর প্রতি সম্মান দেখানো শুধু সামাজিক সৌজন্য নয়; এটি একটি উন্নত রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি।
বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার, মাদক, সহিংসতা, পারিবারিক ভাঙন এবং নৈতিক অবক্ষয়ের মতো নানা সংকট সমাজকে উদ্বিগ্ন করছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নারীর নেতৃত্ব, সচেতনতা এবং মানবিক ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন, গণমাধ্যম এবং রাষ্ট্র—সবাইকে নারীর মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। নারীকে প্রতিপক্ষ নয়, উন্নয়নের সমঅংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।
বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, যে সমাজে নারীর শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং নেতৃত্বের সুযোগ যত বেশি, সেই সমাজ তত বেশি গণতান্ত্রিক, শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ। তাই টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে নারী-পুরুষের সমঅংশীদারিত্ব নিশ্চিত করা সময়ের দাবি।
আজ আমাদের প্রত্যয় হওয়া উচিত—কন্যাশিশুর জন্মকে আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করা, নারীর শিক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য দূর করা, নারীর প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীর মেধা ও যোগ্যতার যথাযথ মূল্যায়ন করা। কারণ একজন নারী যখন এগিয়ে যান, তখন শুধু তাঁর ব্যক্তিগত সাফল্য অর্জিত হয় না; এগিয়ে যায় একটি পরিবার, আলোকিত হয় একটি প্রজন্ম এবং সমৃদ্ধ হয় একটি জাতি।
পরিশেষে বলা যায়, একটি সুস্থ সমাজ গড়ার স্বপ্ন কখনোই বাস্তবায়িত হবে না যদি সেখানে নারী অবহেলিত, অনিরাপদ কিংবা বৈষম্যের শিকার হন। নারীকে সম্মান, অধিকার ও মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করেই আমরা একটি মানবিক, অসাম্প্রদায়িক, ন্যায়ভিত্তিক ও সমৃদ্ধ সমাজ বিনির্মাণ করতে পারি। কারণ নারী কোনো সমাজের প্রান্তিক শক্তি নন; তিনি সেই সমাজের প্রাণশক্তি, বিবেক এবং আগামী দিনের আলোকবর্তিকা।