ইরান-সৌদি উত্তেজনা চরমে, সামরিক শক্তিতে কাদের পাল্লা ভারী?
প্রজ্ঞা নিউজ ডেস্ক:
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে চলমান উত্তেজনার মধ্যে নতুন করে আলোচনায় এসেছে সৌদি আরবের সামরিক অবস্থান। একসময় ইরান-ইসরায়েল সংঘাত সীমিত থাকবে বলে ধারণা করা হলেও পরে এতে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র জড়িয়ে পড়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। পাল্টাপাল্টি হামলার পাশাপাশি আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ নিয়ে উদ্বেগও বেড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, উপসাগরীয় অঞ্চলে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির কারণে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ কয়েকটি দেশ নিজেদের প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি জোরদার করছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি, বাব আল-মান্দেব প্রণালি ও লোহিত সাগরের নৌপথে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নতুন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সামরিক শক্তিতে ইরান এগিয়ে
২০২৬ সালের গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ার (Global Firepower) সূচক অনুযায়ী, বিশ্বের ১৪৫টি দেশের মধ্যে ইরানের অবস্থান ১৬তম এবং সৌদি আরবের অবস্থান ২৫তম। পাওয়ার ইনডেক্সে ইরানের স্কোর ০.৩১৯৯, যেখানে সৌদি আরবের স্কোর ০.৪৪৭৩। এই সূচকে স্কোর যত কম, সামরিক সক্ষমতা তত বেশি বলে বিবেচিত হয়।
জনবল ও সেনাসদস্যে বড় ব্যবধান
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইরানের মোট সামরিক সদস্য প্রায় ১১ লাখ ৮০ হাজার। এর মধ্যে সক্রিয় সদস্য প্রায় ৬ লাখ ১০ হাজার এবং রিজার্ভ সদস্য প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার।
অন্যদিকে সৌদি আরবের মোট সামরিক সদস্য প্রায় ৩ লাখ ৯৭ হাজার, যার মধ্যে সক্রিয় সদস্য প্রায় ২ লাখ ৪৭ হাজার। রিজার্ভ বাহিনীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে অনেক কম।
স্থলবাহিনীতেও ইরান এগিয়ে। দেশটির সেনাবাহিনীতে প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার সদস্য রয়েছে, যেখানে সৌদি আরবের স্থলবাহিনীর সদস্যসংখ্যা প্রায় ৭৫ হাজার।
শুধু জনবল নয়, প্রযুক্তিও গুরুত্বপূর্ণ
বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক যুদ্ধে কেবল সেনাসদস্যের সংখ্যা দিয়ে বিজয় নির্ধারণ করা যায় না। উন্নত যুদ্ধবিমান, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি, ড্রোন সক্ষমতা, গোয়েন্দা তথ্য, সাইবার যুদ্ধ, সরবরাহব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক সামরিক জোটও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমা দেশগুলোর উন্নত অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। অন্যদিকে ইরান নিজস্ব ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন কর্মসূচির মাধ্যমে আঞ্চলিক প্রতিরোধ সক্ষমতা গড়ে তুলেছে।
সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সৌদি আরব একটি বহুজাতিক সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোট গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। এর লক্ষ্য হরমুজ প্রণালি, বাব আল-মান্দেব প্রণালি, লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরে আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের নিরাপত্তা জোরদার করা।
এই জলপথগুলো বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় যেকোনো সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে।
ইরানের সতর্কবার্তা
ইরানের সামরিক কর্মকর্তারা বারবার সতর্ক করে বলেছেন, কোনো দেশ যদি ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে নিজেদের ভূখণ্ড ব্যবহারের সুযোগ দেয়, তবে সেই দেশও সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়ার মুখোমুখি হতে পারে। একই সঙ্গে তেহরান দাবি করছে, আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংকটের মূল কারণ বিদেশি সামরিক উপস্থিতি।
শেষ পর্যন্ত কে এগিয়ে?
গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ারের সামগ্রিক সূচকে ইরান সৌদি আরবের চেয়ে এগিয়ে থাকলেও সম্ভাব্য সংঘাতের ফলাফল কেবল র্যাংকিং দিয়ে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। যুদ্ধের কৌশল, অস্ত্রের মান, আকাশ প্রতিরক্ষা, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা, আন্তর্জাতিক সমর্থন, সরবরাহব্যবস্থা এবং যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তব পরিস্থিতিই শেষ পর্যন্ত বড় ভূমিকা রাখবে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা অব্যাহত থাকলেও সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কূটনৈতিক তৎপরতাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশ্লেষকদের মতে, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সামরিক শক্তির পাশাপাশি রাজনৈতিক সমাধানের পথও সমান গুরুত্ব বহন করে।
তথ্যসূত্র: গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ার ইনডেক্স (২০২৬), আল জাজিরা, বিবিসি, জাগোনিউজ



















