জ্যাকসন হাইটসের ৭৩ নম্বর স্ট্রিট: প্রবাসে এক টুকরো বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ভারত—খাবার, ভাষা, পোশাক ও সংস্কৃতির মেলবন্ধনে নিউইয়র্কে দক্ষিণ এশিয়ার প্রাণকেন্দ্র
প্রজ্ঞা নিউজ ডেস্ক, হাকিকুল ইসলাম খোকন:
নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটসের ৭৪ নম্বর স্ট্রিটে পা রাখলেই অনেকের মনে হতে পারে—এ যেন যুক্তরাষ্ট্রের কোনো ব্যস্ত সড়ক নয়, বরং বাংলাদেশ, পাকিস্তান কিংবা ভারতের কোনো পরিচিত শহরের প্রাণচঞ্চল একটি রাস্তা। চারপাশের কোলাহল, দোকানপাটের সারি, দক্ষিণ এশীয় পোশাক, মসলার ঘ্রাণ এবং বাংলা, উর্দু ও হিন্দিসহ নানা ভাষার ব্যবহার মুহূর্তেই প্রবাসীদের ফিরিয়ে নেয় শেকড়ের কাছে।
দীর্ঘদিন ধরে জ্যাকসন হাইটস নিউইয়র্কের দক্ষিণ এশীয় অভিবাসীদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আবাসিক, বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। বিশেষ করে ৭৪ নম্বর স্ট্রিট বাংলাদেশি, পাকিস্তানি ও ভারতীয় কমিউনিটির মানুষের কাছে কেনাকাটা, খাবার, আড্ডা ও সামাজিক যোগাযোগের অন্যতম পরিচিত ঠিকানা হয়ে উঠেছে।
এখানকার দোকানগুলোতে দক্ষিণ এশিয়ার নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ব্যাপক সমাহার দেখা যায়। দেশি মাছ, শাকসবজি, চাল, ডাল, মসলা, মিষ্টি, হালাল মাংস, প্রসাধনী, ধর্মীয় সামগ্রী, বই, পোশাক থেকে শুরু করে গৃহস্থালির নানা পণ্য পাওয়া যায় সহজেই। বাংলাদেশের বিভিন্ন পরিচিত ব্র্যান্ডের পণ্যও অনেক দোকানে পাওয়া যায়, যা প্রবাসীদের কাছে বাড়তি আকর্ষণ তৈরি করেছে।
খাবারের ক্ষেত্রেও ৭৪ নম্বর স্ট্রিট ও আশপাশের এলাকা যেন দক্ষিণ এশিয়ার এক উন্মুক্ত খাদ্যভাণ্ডার। বাংলাদেশি, পাকিস্তানি ও ভারতীয় রেস্তোরাঁগুলোতে প্রতিদিন ভিড় করেন বিভিন্ন বয়স ও পেশার মানুষ। বিরিয়ানি, কাচ্চি, ফুচকা, চটপটি, হালিম, কাবাব, নান, পরোটা, মিষ্টিসহ নানা ঐতিহ্যবাহী খাবারের স্বাদ নিতে দূর-দূরান্ত থেকেও অনেকে ছুটে আসেন।
তবে ৭৪ নম্বর স্ট্রিটের গুরুত্ব শুধু ব্যবসা-বাণিজ্য কিংবা খাবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি দক্ষিণ এশীয় সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও সামাজিক যোগাযোগেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। বিভিন্ন জাতীয় দিবস, ধর্মীয় উৎসব, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সামাজিক কর্মসূচি ও কমিউনিটি আয়োজনের মধ্য দিয়ে প্রবাসীরা নিজেদের শেকড় ও ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখছেন।
রাস্তা দিয়ে হাঁটলেই বাংলা, উর্দু, হিন্দি, নেপালি, স্প্যানিশ ও ইংরেজি ভাষার মিশ্র ব্যবহার চোখে পড়ে। বিশেষ করে বাংলা ভাষায় লেখা দোকানের সাইনবোর্ড ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নাম বাংলাদেশি অভিবাসীদের মধ্যে আপন অনুভূতি তৈরি করে। নতুন অভিবাসীদের কাছেও এলাকাটি অনেকটা পরিচিত ও স্বস্তিদায়ক পরিবেশের মতো মনে হয়।
কর্মব্যস্ত প্রবাসজীবনে অনেকের কাছেই জ্যাকসন হাইটস শুধু কেনাকাটার জায়গা নয়—এটি হয়ে উঠেছে সামাজিক যোগাযোগ ও নস্টালজিয়ার একটি কেন্দ্র। কেউ আসেন বাজার করতে, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে, কেউ পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে, আবার কেউ আসেন দেশের খাবার ও পরিচিত পরিবেশের স্বাদ নিতে।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের কমিউনিটিভিত্তিক বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র অভিবাসীদের সামাজিক বন্ধন শক্তিশালী করার পাশাপাশি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের কাছে নিজেদের ভাষা, খাবার, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের পরিচয় তুলে ধরার ক্ষেত্রে এসব এলাকার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রবাসে বসবাস করলেও শেকড়ের সঙ্গে সম্পর্ক অটুট রাখার আকাঙ্ক্ষা মানুষের সহজাত। সেই আকাঙ্ক্ষার দৃশ্যমান প্রতিফলন যেন জ্যাকসন হাইটসের ৭৪ নম্বর স্ট্রিটে। এখানে একই সঙ্গে মিলেছে দক্ষিণ এশিয়ার খাবার, ভাষা, পোশাক, ব্যবসা, সংস্কৃতি ও মানুষের আন্তরিকতা।
তাই অনেক প্রবাসীর কাছে জ্যাকসন হাইটসের ৭৪ নম্বর স্ট্রিট কেবল একটি ব্যস্ত বাণিজ্যিক সড়ক নয়—এটি নিউইয়র্কের বুকে দক্ষিণ এশিয়ার বহুত্ববাদী সংস্কৃতির এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি; প্রবাসে গড়ে ওঠা এক টুকরো বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ভারত।



















