নিউইয়র্কে ভারতের ৮০তম স্বাধীনতা দিবস: বর্ণাঢ্য ইন্ডিয়া ডে প্যারেডে দেশপ্রেম ও ঐতিহ্যের মহামিলন; ম্যানহাটনে রঙ, সংস্কৃতি ও দেশাত্মবোধের ঢেউ—‘Harmony in Heritage’ প্রতিপাদ্যে ৪৪তম ইন্ডিয়া ডে প্যারেড
উত্তম কুমার সাহা , প্রজ্ঞা নিউজ ডেস্ক :
ভারতের ৮০তম স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে নিউইয়র্কের ম্যানহাটনে অনুষ্ঠিত হলো ৪৪তম ঐতিহ্যবাহী ইন্ডিয়া ডে প্যারেড ২০২৬। রোববার, ১৬ আগস্ট ম্যাডিসন অ্যাভিনিউজুড়ে ভারতীয় সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, দেশপ্রেম ও সম্প্রীতির এক বর্ণাঢ্য মিলনমেলা বসে। এবারের প্যারেডের মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘Harmony in Heritage’—ঐতিহ্যে সম্প্রীতি।
ভারতের বাইরে অনুষ্ঠিত অন্যতম বৃহৎ ভারতীয় সাংস্কৃতিক এই আয়োজনটি প্রতিবছরের মতো এবারও আয়োজন করে Federation of Indian Associations (FIA)। ১৯৮১ সাল থেকে চলে আসা এই ঐতিহ্যবাহী ইন্ডিয়া ডে প্যারেড প্রবাসী ভারতীয়দের সাংস্কৃতিক পরিচয়, ঐক্য ও দেশপ্রেম প্রকাশের অন্যতম প্রধান মঞ্চ হিসেবে পরিচিত।
দুপুর ১২টায় ম্যানহাটনের ম্যাডিসন অ্যাভিনিউয়ের ইস্ট ৩৯তম স্ট্রিট থেকে প্যারেড শুরু হয়ে ইস্ট ২৬তম স্ট্রিট পর্যন্ত এগিয়ে যায়। প্যারেড চলাকালে রাস্তার দুই পাশে বিপুলসংখ্যক দর্শনার্থীর উপস্থিতিতে পুরো এলাকা পরিণত হয় উৎসবের নগরীতে। ভারতের জাতীয় পতাকা হাতে নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর ও বিভিন্ন বয়সী মানুষের উচ্ছ্বাসে মুখর হয়ে ওঠে ম্যানহাটন।
রঙিন ফ্লোট, ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের ঐতিহ্যবাহী পোশাক, নৃত্য, সংগীত, দেশাত্মবোধক গান এবং নানা ধরনের সাংস্কৃতিক পরিবেশনা ছিল প্যারেডের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। শঙ্খ, বাঁশি ও ঢোলের সম্মিলিত বাদ্যধ্বনি, ভারতীয় গান ও দেশাত্মবোধক স্লোগানে ম্যাডিসন অ্যাভিনিউজুড়ে সৃষ্টি হয় এক অনন্য আবহ। ভারতীয় চলচ্চিত্র ও বিনোদন জগতের অভিনেতা-অভিনেত্রী ও শিল্পীদের অংশগ্রহণ অনুষ্ঠানকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে।
নিউইয়র্ক ছাড়াও নিউ জার্সি, কানেকটিকাটসহ বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য থেকে বিপুলসংখ্যক ভারতীয়-আমেরিকান এই প্যারেডে অংশ নেন। বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ব্যবসায়িক ও কমিউনিটি সংগঠন নিজেদের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও পরিচয় তুলে ধরে প্যারেডকে করে তোলে আরও বর্ণিল ও প্রাণবন্ত। বিভিন্ন সংগঠনের সাজানো ফ্লোট, ব্যানার ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনা ছিল দর্শনার্থীদের জন্য বিশেষ আকর্ষণের।
নিউইয়র্কের গভর্নর Kathy Hochul-এর উপস্থিতি এবারের ইন্ডিয়া ডে প্যারেডে বিশেষ মাত্রা যোগ করে। প্যারেডে গভর্নরের পক্ষ থেকে প্রদর্শিত বিশেষ উপস্থাপনাও দর্শকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ভারতীয়-আমেরিকান সম্প্রদায়ের নিউইয়র্কের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অবদানের প্রশংসা করা হয়।
নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যে ১৫ আগস্টকে India Independence Day হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার উদ্যোগও এবারের উদযাপনকে বিশেষ তাৎপর্য দিয়েছে। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং নিউইয়র্কে ভারতীয়-আমেরিকানদের অবদানের বিষয়টি এ উদ্যোগে গুরুত্ব পেয়েছে।
ম্যানহাটনের মূল প্যারেডের পাশাপাশি কুইন্স ও নিউইয়র্কের ট্রাই-স্টেট এলাকার বিভিন্ন স্থানে ভারতের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে পতাকা উত্তোলন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও নানা কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। টাইমস স্কয়ারেও স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে বিশেষ কর্মসূচি পালিত হয়। নিউইয়র্কের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ভারতীয় তেরঙ্গার উপস্থিতি প্রবাসী ভারতীয়দের দেশপ্রেমের বহিঃপ্রকাশ ঘটায়।
বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ডেমোক্রেটিক পার্টির ডিস্ট্রিক্ট ও কমিউনিটি লিডার ড. দিলীপ নাথ প্রজ্ঞা নিউজকে বলেন, ভারতীয়রা তাদের দেশকে গভীরভাবে ভালোবাসে। তাদের কাছে দেশ, দেশের সম্মান, সংস্কৃতি ও মর্যাদা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রবাসে থেকেও নিজেদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরতে তারা সম্মিলিতভাবে কাজ করেন। আর এ কারণেই নিউইয়র্কের মতো আন্তর্জাতিক নগরীতে ইন্ডিয়া ডে প্যারেড এত ব্যাপক ও সফল আয়োজন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
বাংলাদেশি কমিউনিটির নেতা শক্তি ডি গুপ্তা বলেন, এ ধরনের বিশাল আয়োজন একক প্রচেষ্টায় সফল করা সম্ভব নয়। এর পেছনে থাকে হাজারো মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টা, পরিকল্পনা ও আন্তরিকতা। নিউইয়র্কের রাজপথে বিপুল মানুষের অংশগ্রহণ এবং এত সুন্দর সাংস্কৃতিক উপস্থাপনা যেকোনো দেশের মানুষের জন্য অনুপ্রেরণার বিষয়।
প্যারেডে অংশ নেওয়া ভারতীয়দের অনেকেই বলেন, তারা প্রবাসে বসবাস করলেও দেশের প্রতি ভালোবাসা তাদের চিন্তা ও চেতনায় সবসময় অটুট। তাদের কাছে ভারত, ভারতের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও দেশের সম্মান সবার আগে। নতুন প্রজন্মের কাছে নিজেদের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও শিকড়ের পরিচয় তুলে ধরার জন্যই তারা প্রতিবছর এ ধরনের আয়োজনে অংশ নেন।
এবারের ইন্ডিয়া ডে প্যারেড শুধু ভারতের স্বাধীনতার আনন্দ উদযাপনেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি হয়ে উঠেছিল ভারতের বহুত্ববাদী সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের এক বিশাল প্রদর্শনী। দেশটির বিভিন্ন প্রদেশ, ভাষা, পোশাক, সংগীত, নৃত্য ও সংস্কৃতির বৈচিত্র্য একই মঞ্চে তুলে ধরা হয়।
‘Harmony in Heritage’—এই প্রতিপাদ্য যেন পুরো আয়োজনের মধ্যেই বাস্তব রূপ পায়। বিভিন্ন ভাষা, অঞ্চল ও সংস্কৃতির মানুষ একই পতাকার নিচে দাঁড়িয়ে উদযাপন করেন ভারতের স্বাধীনতা। তেরঙ্গা পতাকার ঢেউ, ঢোল-বাদ্যের ছন্দ, ভারতীয় গান, নৃত্য, স্লোগান, বর্ণিল ফ্লোট এবং হাজারো মানুষের উচ্ছ্বাসে ১৬ আগস্টের নিউইয়র্কের ম্যাডিসন অ্যাভিনিউ হয়ে ওঠে যেন এক টুকরো ভারত।
প্রবাসের মাটিতে ভারতের স্বাধীনতা দিবসের এই বর্ণাঢ্য আয়োজন আবারও প্রমাণ করল—দেশ থেকে হাজার মাইল দূরে থাকলেও ইতিহাস, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও মাতৃভূমির প্রতি ভালোবাসা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বেঁচে থাকে।



















