Logo

ইউএসএ নিউজ    >>   ২১ আগস্টের রক্তাক্ত ইতিহাস ও বিচারের নতুন অধ্যায়: নিউইয়র্কে শহীদদের স্মরণে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের দোয়া ও আলোচনা সভা

২১ আগস্টের রক্তাক্ত ইতিহাস ও বিচারের নতুন অধ্যায়: নিউইয়র্কে শহীদদের স্মরণে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের দোয়া ও আলোচনা সভা

২১ আগস্টের রক্তাক্ত ইতিহাস ও বিচারের নতুন অধ্যায়: নিউইয়র্কে শহীদদের স্মরণে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের দোয়া ও আলোচনা সভা

প্রজ্ঞা নিউজ ডেস্ক, উত্তম কুমার সাহা, হুমায়ূন কবীর ঢালী, নিউইয়র্ক:

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ঢাকার বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের সমাবেশে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলায় নিহত শহীদদের স্মরণে নিউইয়র্কে দোয়া ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের উদ্যোগে গতকাল ২১ আগস্ট জ্যাকসন হাইটসের নবান্ন পার্টি সেন্টারে এ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।

যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সভাপতি ড. সিদ্দিকুর রহমানের সভাপতিত্বে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত ও শোক পালনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলায় নিহত আইভী রহমানসহ ২৪ শহীদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। পরে শহীদদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে দোয়া ও মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়। এরপর গভীর ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত ও যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় সংগীত পরিবেশন করা হয়।

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনার সমাবেশে একের পর এক গ্রেনেড বিস্ফোরণে আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদক আইভী রহমানসহ ২৪ জন নিহত হন। আহত হন শতাধিক, বিভিন্ন সূত্রে আহতের সংখ্যা কয়েকশ’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। হামলার লক্ষ্য ছিল সমাবেশে উপস্থিত আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব এবং বিশেষ করে শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা—এমন অভিযোগ ও বক্তব্য দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক ও বিচারিক আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে। 

এই হত্যাকাণ্ডের পর মামলা, তদন্ত এবং বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে নানা বিতর্ক তৈরি হয়। তদন্তের গতিপথ পরিবর্তন, জজ মিয়া নামে একজনকে দিয়ে কথিত সাজানো জবানবন্দি আদায়ের অভিযোগ এবং হামলার আলামত সংরক্ষণ ও তদন্তের নানা বিষয়ও পরবর্তী সময়ে ব্যাপক আলোচনায় আসে। ২০০৭ সালে মামলার অধিকতর তদন্ত শুরু হয় এবং ২০০৮ সালে প্রথম অভিযোগপত্র দেওয়া হয়; পরবর্তী অধিকতর তদন্তের ভিত্তিতে সম্পূরক অভিযোগপত্রে আরও আসামি যুক্ত করা হয়। 

দীর্ঘ ১৪ বছর পর ২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ আলোচিত হত্যা ও বিস্ফোরক মামলার রায় ঘোষণা করেন। ওই রায়ে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর ও সাবেক শিক্ষা উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুসহ ১৯ জনকে মৃত্যুদণ্ড, তারেক রহমানসহ ১৯ জনকে যাবজ্জীবন এবং আরও ১১ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। 

তবে পরবর্তী বিচারিক প্রক্রিয়ায় মামলাটি নতুন মোড় নেয়। ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর হাইকোর্ট সম্পূরক অভিযোগপত্রের ভিত্তিতে বিচারিক আদালতের বিচারকে অবৈধ ও বাতিল ঘোষণা করে এবং দণ্ডিত আসামিদের আপিল মঞ্জুর করে সবাইকে খালাস দেন। পরে রাষ্ট্রপক্ষ এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করে। 

সর্বশেষ, ২০২৬ সালের আগস্টে আপিল বিভাগ হাইকোর্টের খালাসের রায় বহাল রাখেন। একই সঙ্গে হাইকোর্টের রায়ের কিছু পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশনার অংশ সংশোধন ও প্রত্যাহার করা হয়। ফলে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার বিচারিক ইতিহাসে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ নতুন অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। 

নিউইয়র্কের আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, ২১ আগস্টের ঘটনা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম মর্মান্তিক অধ্যায়। তাঁরা শহীদদের আত্মত্যাগের স্মৃতি সংরক্ষণ এবং ঘটনার প্রকৃত ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

স্বাগত বক্তব্য ও অতিথি পরিচিতি পর্বের পর সভার সভাপতি ড. সিদ্দিকুর রহমান এবং সাধারণ সম্পাদক আবদুস সামাদ আজাদ বক্তব্য রাখেন। সভা পরিচালনা করেন যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুস সামাদ আজাদ।

অনুষ্ঠানে পর্যায়ক্রমে বক্তব্য রাখেন যুক্তরাষ্ট্র ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হৃদয় মিয়া ও সভাপতি মাহমুদুল হাসান, স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ কিবরিয়া জামান ও সভাপতি এইচ এম ইকবাল, যুবলীগ নেতা জুলফিকার আহমেদ, যুক্তরাষ্ট্র যুবলীগের সভাপতি সেবুল মিয়া, ভার্জিনিয়া স্টেট আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ড. মোহাম্মদ হোসেন ও সভাপতি জি আই রাসেল, নিউইয়র্ক স্টেট আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহীন আজমল, যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নাফিকুর রহমান তুরান, বাংলাদেশ সোসাইটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামীলীগের সহসভাপতি জয়নুল আবেদীন ও পান্না, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক দুরুদ মিয়া, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপকমিটির সদস্য আমিনুল ইসলাম, যুক্তরাষ্ট্র ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি জাহিদ হাসান, যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের যুব ও ক্রীড়া সম্পাদক মাহবুবুর রহমান টুকু, ইলিয়ার রহমান, এমদাদ রাজু, শিল্প ও বাণিজ্য সম্পাদক জনি সিকদার, সবুজ, সহসভাপতি আশরাফ উদ্দিন ও সোলায়মান আলী, নিউইয়র্ক স্টেট আওয়ামী লীগ নেতা গোলাম রাব্বানী এবং যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগ নেতা শাহানা রহমান।

সভায় প্রধান অতিথি ও বিশেষ বক্তা হিসেবে বক্তব্য রাখেন সাবেক উপমন্ত্রী ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক এনামুল হক শামীম এবং মাননীয় হুইপ ও বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম বাবু।

এনামুল হক শামীম তাঁর বক্তব্যে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড এবং ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বলেন, জননেত্রী শেখ হাসিনা দেশ ও মানুষের কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করেছেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তিনি দল ও দেশের জন্য কাজ করেছেন। তিনি নেতাকর্মীদের সব ধরনের মিথ্যাচার, অপপ্রচার ও ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান।

নজরুল ইসলাম বাবু তাঁর বক্তব্যে ছাত্ররাজনীতি ও রাজপথের দীর্ঘ সংগ্রামের স্মৃতিচারণ করে বলেন, আওয়ামী লীগের শিকড় বাংলার মাটির অনেক গভীরে। নানা প্রতিকূলতা, আন্দোলন-সংগ্রাম ও ষড়যন্ত্রের মধ্য দিয়েও দলটি তার রাজনৈতিক ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। অপপ্রচার চালিয়ে এই ঐতিহ্যবাহী দলকে দমানো যাবে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

বক্তারা ২১ আগস্টের শহীদদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, এই হত্যাকাণ্ডের ইতিহাস রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা প্রয়োজন। একই সঙ্গে তাঁরা বিচারপ্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপ জনগণের সামনে স্বচ্ছভাবে তুলে ধরার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

আলোচনা সভায় বক্তারা আরও বলেন, ২১ আগস্ট শুধু একটি রাজনৈতিক দলের ওপর হামলার ঘটনা নয়; এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতির ইতিহাসে এক গভীর ক্ষত। সেই দিনের নিহতদের স্মরণ, আহতদের প্রতি শ্রদ্ধা এবং ঘটনার সত্য ইতিহাস সংরক্ষণ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের দায়িত্ব।

পরিশেষে প্রবাসে আওয়ামী লীগের সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ থেকে দলের আদর্শ অনুসরণ এবং জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বকে শক্তিশালী করার আহ্বান জানানো হয়। শহীদদের আত্মার মাগফিরাত কামনা এবং দেশের শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনার মধ্য দিয়ে সভার সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।