যুক্তরাষ্ট্রের রেস্তোরাঁয় বদলাচ্ছে টিপ সংস্কৃতি?
প্রজ্ঞা নিউজ ডেস্ক:
রেস্তোরাঁয় খাবার শেষে বিল হাতে পাওয়ার পর কত বকশিশ দিতে হবে—এ নিয়ে গ্রাহকদের দ্বিধা দীর্ঘদিনের। যুক্তরাষ্ট্রের অনেক রেস্তোরাঁয় খাবারের দামের বাইরে বকশিশ দেওয়া প্রায় অলিখিত নিয়মে পরিণত হলেও সেই সংস্কৃতিতে এখন পরিবর্তনের চেষ্টা চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের কিছু রেস্তোরাঁ বকশিশ নেওয়ার পরিবর্তে খাবারের দাম বাড়িয়ে কর্মীদের নির্দিষ্ট ও তুলনামূলক বেশি বেতন দেওয়ার মডেল গ্রহণ করেছে। ফলে মেনুতে যে দাম লেখা থাকে, গ্রাহককে মূলত সেটিই পরিশোধ করতে হয়। আলাদা করে ২০ শতাংশ বা তার বেশি বকশিশ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকে না।
এই ব্যবস্থার পেছনে মূল প্রশ্ন হলো—রেস্তোরাঁকর্মীদের আয় কি গ্রাহকের উদারতার ওপর নির্ভর করবে, নাকি তাদের ন্যায্য বেতন নিশ্চিত করবে প্রতিষ্ঠান?
‘আপনি যা দেখছেন, সেটিই আপনার দাম’
সান ফ্রান্সিসকোর লা সিগালে রেস্তোরাঁ (La Cigale) এই ধরনের বকশিশবিহীন ব্যবস্থার একটি উদাহরণ। সেখানে নির্ধারিত খাবারের মূল্য প্রতি ব্যক্তি ১৪০ ডলার। দাম তুলনামূলক বেশি হলেও এর মধ্যেই কর্মীদের বেশি বেতনের খরচ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। রেস্তোরাঁটির নীতি হলো—মেনুতে যে দাম দেখা যাচ্ছে, সেটিই গ্রাহকের পরিশোধযোগ্য অর্থ। সেখানে বকশিশ না দিলেও চলে। বরং ভালো কথা বলা এবং আবার রেস্তোরাঁয় ফিরে আসাকেই যথেষ্ট বলে মনে করা হয়। সেখানে ওয়াইন পরিবেশনকারী ক্যারোলিন ক্রেটজার ঘণ্টায় ৪০ ডলার আয় করেন। সান ফ্রান্সিসকোর অধিকাংশ সেবা কর্মীর তুলনায় তার এই আয় প্রায় দ্বিগুণ।
ক্রেটজারের মতে, এই ব্যবস্থার বড় সুবিধা হলো নিজের আয় নিয়ে অনিশ্চয়তা কমে যাওয়া। বকশিশনির্ভর ব্যবস্থায় অতিথিরা আসার আগের প্রস্তুতির সময় কিংবা অতিথিরা চলে যাওয়ার পরের কাজের পুরো সময়ের জন্য একই ধরনের আয় পাওয়া যায় না। ফলে কর্মীদের একটি অংশ সেই সময় কেবল ন্যূনতম মজুরি পান।
রান্নাঘরের কর্মীরা কেন কম পাবেন?
বকশিশবিহীন ব্যবস্থা চালুর অন্যতম কারণ সামনের সারির কর্মী ও রান্নাঘরের কর্মীদের মধ্যে আয়ের বৈষম্য। ম্যাসাচুসেটসের লিন শহরের Nightshade Noodle Bar-এর শেফ ও মালিক র্যাচেল মিলার পাঁচ বছর আগে বকশিশ বন্ধ করেন। তার লক্ষ্য ছিল কর্মীদের মধ্যে আয়ের পার্থক্য কমানো। রেস্তোরাঁর রান্নাঘরের কর্মীরা দীর্ঘ সময় কঠোর পরিশ্রম করলেও গ্রাহকদের সামনে তাদের উপস্থিতি থাকে না। অন্যদিকে একই সময়ে কাজ করা পরিবেশনকারীরা বকশিশের কারণে অনেক বেশি আয় করতে পারতেন।
মিলার আরও লক্ষ্য করেন, শ্বেতাঙ্গ পুরুষ কর্মীরা তুলনামূলক বেশি বকশিশ পাচ্ছেন, অন্য কর্মীরা পাচ্ছেন কম। তার মতে, গ্রাহকরা সচেতনভাবে বা অজান্তেই লিঙ্গ, জাতিগত পরিচয় কিংবা যৌন পরিচয়ের ভিত্তিতে কর্মীদের বকশিশের পরিমাণে পার্থক্য তৈরি করতে পারেন। তাই কর্মীদের বেশি ও নির্দিষ্ট বেতন দিতে খাবারের দামও বাড়ানো হয়েছে।
বর্তমানে সন্ধ্যা ৬টার আগে সেখানে সাত পদের টেস্টিং মেনুর দাম শুরু হয় ১০২ ডলার থেকে এবং নয় পদের মেনুর দাম ১২৬ ডলার থেকে। মিলারের বক্তব্য, একই ধরনের রেস্তোরাঁর তুলনায় দাম বেশি মনে হলেও সেই দামের মধ্যেই কর্মীদের ন্যায্য বেতনের খরচ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
দাম বাড়ালেই কি গ্রাহক রাজি?
বকশিশবিহীন ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখানেই। সব রেস্তোরাঁ এই মডেলে সফল হয়নি। ম্যাসাচুসেটসের ক্যামব্রিজের Talulla ২০২০ সালে বকশিশ বন্ধ করে কর্মীদের আরও সমানভাবে বেতন দেওয়ার উদ্যোগ নেয়। এ জন্য মেনুর দাম ২৩ শতাংশ বাড়ানো হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত সেই ব্যবস্থা টেকেনি। গত বছরের সেপ্টেম্বরে রেস্তোরাঁটি আবার বকশিশ চালু করে।
সহ-মালিক ড্যানিয়েল আয়ারের মতে, টিপবিহীন রেস্তোরাঁ পরিচালনা সামগ্রিকভাবে বেশি ব্যয়বহুল। কারণ বকশিশ রেস্তোরাঁর রাজস্বের অংশ নয়। কিন্তু খাবারের দাম বাড়ালে সেই অর্থ রাজস্বের অংশ হয়ে যায়। ফলে রেস্তোরাঁকে অতিরিক্ত বিক্রয়করও দিতে হয়। অর্থাৎ কর্মীদের বেতন বাড়াতে খাবারের দাম বাড়ানো শুধু গ্রাহকের জন্য নয়, মালিকদের জন্যও বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি করে।
কোথাও আবার সফলতার নজির
নিউইয়র্কের নিরামিষ রেস্তোরাঁ Dirt Candy ২০১৫ সালেই বকশিশ বন্ধ করেছিল। শেফ ও মালিক আমান্ডা কোহেনের লক্ষ্য ছিল কর্মীদের জন্য আরও সমান একটি বেতন কাঠামো তৈরি করা। বর্তমানে তিনি কর্মীদের ঘণ্টায় প্রায় ৩০ ডলার বেতন দেন। কোহেন জানান, অনেক গ্রাহক যখন জানতে পারেন যে খাবারের বিলের সঙ্গে আলাদা করে ২০ শতাংশ বকশিশ দিতে হবে না, তখন তারা বরং খুশি হন।
বকশিশের অনিশ্চয়তা থেকে নির্দিষ্ট বেতনে
ক্যালিফোর্নিয়ার অকল্যান্ডের একটি টিপবিহীন রেস্তোরাঁয় কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাতা ক্যাসিডি ভ্যান ডার ক্যাম্প Tipless নামে একটি ইউটিউব প্রামাণ্যচিত্র তৈরি করেছেন। তিনি জানান, রেস্তোরাঁটি বকশিশ বন্ধ করার পর বেশ কয়েকজন কর্মী চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলেন। তবে তিনি থেকে যান। এর আগে তিনি ঘণ্টায় প্রায় ১০ ডলার বেতন পেতেন, সঙ্গে থাকত বকশিশ। বকশিশ বন্ধ হওয়ার পর তার আয় বেড়ে দাঁড়ায় ঘণ্টায় ২১ ডলারে।
‘টিপিং ফ্যাটিগ’ কি বদলে দেবে সংস্কৃতি?
বকশিশ নিয়ে গ্রাহকদের মধ্যেও অসন্তোষ বাড়ছে। খাবারের দাম, কর ও অন্যান্য চার্জ দেওয়ার পর আবার ২০ শতাংশ বা তার বেশি বকশিশ দেওয়ার বিষয়টিকে অনেকেই ‘টিপিং ফ্যাটিগ’ বা বকশিশ দেওয়ার ক্লান্তি হিসেবে দেখছেন। তবে এই অসন্তোষের কারণে অচিরেই যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে বকশিশের সংস্কৃতি পুরোপুরি বদলে যাবে—এমনটা মনে করছেন না বিশেষজ্ঞরা।
অধ্যাপক লিনের মতে, বকশিশ থেকে কর্মীরা যে অতিরিক্ত আয় করেন, সেটি বাদ দেওয়ার অর্থনৈতিক অসুবিধা অনেক ক্ষেত্রেই এর সুবিধার চেয়ে বেশি। বিশেষ করে দক্ষ পরিবেশনকারী কর্মীদের আকৃষ্ট করা এবং ধরে রাখা টিপসবিহীন রেস্তোরাঁগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
শেষ পর্যন্ত কোন মডেল টিকবে?
বকশিশ থাকবে, নাকি খাবারের দাম বাড়িয়ে কর্মীদের নির্দিষ্ট বেতন দেওয়া হবে—এ বিতর্কের সহজ কোনো উত্তর নেই। বকশিশ কর্মীদের বেশি আয় করার সুযোগ দিতে পারে, তবে সেই আয় অনিশ্চিত। একই ধরনের কাজ করেও কর্মীদের মধ্যে বড় ধরনের আয়ের পার্থক্য তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে বকশিশবিহীন মডেলে কর্মীরা নির্দিষ্ট ও তুলনামূলক বেশি বেতন পান। এতে আর্থিক নিশ্চয়তা বাড়ে। তবে সেই বাড়তি ব্যয়ের একটি অংশ শেষ পর্যন্ত গ্রাহক ও রেস্তোরাঁ—দুই পক্ষকেই বহন করতে হয়।
র্যাচেল মিলারের কাছে অবশ্য কর্মীদের ধরে রাখতে পারাটাই সবচেয়ে বড় সাফল্য। রেস্তোরাঁ শিল্পে কর্মীদের চলে যাওয়ার হার বেশি হলেও বকশিশ বন্ধ করার পর তার প্রতিষ্ঠানের কিছু কর্মী দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন। শেষ পর্যন্ত তাই প্রশ্নটি শুধু গ্রাহক বিলের শেষে বকশিশ দিলেন কি না, তা নয়। বরং বড় প্রশ্ন হলো—রেস্তোরাঁয় কাজ করা একজন কর্মী মাসের শেষে নিজের আয় কত হবে, তা কি আগেই নিশ্চিতভাবে জানেন? যুক্তরাষ্ট্রের কিছু রেস্তোরাঁ অন্তত সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে একটি সরল নীতিতে—মেনুতে আপনি যে দাম দেখছেন, সেটিই আপনার পরিশোধের পরিমাণ। সূত্র: বিবিসি, জাগোনিউজ



















