ট্যাক্সির স্টিয়ারিংয়ে জীবিকা, উপার্জনে জ্বালালেন শিক্ষার আলো: নিউইয়র্ক প্রবাসী মোশাররফের অনন্য দৃষ্টান্ত—নিজের পড়াশোনা থেমেছিল অভাবে, দেশে গড়ে তুলেছেন ৬ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান
প্রজ্ঞা নিউজ ডেস্ক :
নিজের পড়াশোনা বেশিদূর এগোয়নি। পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে অল্প বয়সেই থেমে গিয়েছিল শিক্ষাজীবন। জীবিকার সন্ধানে পাড়ি জমিয়েছিলেন কাতারে। সেখানে নির্মাণশ্রমিক হিসেবে পাথর ভেঙেছেন, রোদে-ঘামে কঠিন পরিশ্রম করেছেন। পরে ভাগ্যের সন্ধানে চলে আসেন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে। শুরুতে নির্মাণশ্রমিক, রেস্তোরাঁ ও ফাস্টফুডের দোকানে কাজ করে অবশেষে ট্যাক্সি চালানো শুরু করেন।
কিন্তু নিজের জন্য অর্থ উপার্জন করাই তাঁর জীবনের লক্ষ্য হয়ে ওঠেনি। তিন দশকেরও বেশি সময় নিউইয়র্কের রাজপথে ট্যাক্সি চালিয়ে উপার্জিত অর্থের বড় অংশ তিনি ব্যয় করেছেন জন্মভূমির মানুষের শিক্ষা ও কল্যাণে। নিজের নামে গড়ে তুলেছেন কলেজ, উচ্চবিদ্যালয়, মাদ্রাসা ও কিন্ডারগার্টেনসহ ছয়টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠা করেছেন দুটি পাঠাগার। হাসপাতালের জন্য দিয়েছেন প্রায় দুই কোটি টাকা মূল্যের জমি। দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য চালু করেছেন শিক্ষাবৃত্তি। গৃহহীন পরিবারকে দিয়েছেন ঘর।
এই বিরল মানবিক উদ্যোগের নেপথ্যে থাকা মানুষটি হলেন মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী। কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার ধানাদৌল গ্রামের এই প্রবাসী বাংলাদেশি নিজের জীবনকে কেবল সাফল্যের গল্পে সীমাবদ্ধ রাখেননি; বরং তাঁর উপার্জনকে রূপ দিয়েছেন একটি জনপদের শিক্ষার আলো জ্বালানোর শক্তিতে।
মোশাররফের জীবন যেন প্রমাণ করে—মানুষ চাইলে ব্যক্তিগত সীমাবদ্ধতাকেও অতিক্রম করে একটি সমাজের ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে।
মোশাররফের বয়স যখন মাত্র পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার মতো, তখনই তাঁর বাবা আবদুর রাজ্জাক খান চৌধুরী মারা যান। শিক্ষক বাবার মৃত্যুর পর বড় সন্তান হিসেবে সংসারের দায়িত্ব এসে পড়ে তাঁর ওপর। ছয় ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। মা এবং ছোট ভাই-বোনদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে অল্প বয়সেই তাঁকে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়।
১৯৮২ সালে জীবিকার সন্ধানে কাতারে যান মোশাররফ। নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজ করতে গিয়ে কঠিন পাথর ভেঙেছেন, পাইলিংয়ের কাজে শ্রম দিয়েছেন। সহকর্মীদের অনেকেই যেখানে কঠিন পাথর ভাঙার কাজ করতে ব্যর্থ হয়েছেন, সেখানে পরিবারের মুখ মনে করে তিনি থামেননি। হাতুড়ির আঘাতে পায়ে আঘাত লেগেছে, হাতে ফোস্কা পড়েছে—তবুও কাজ ছেড়ে দেননি।
সেই শ্রমের উপার্জনই পরবর্তীতে তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় সামাজিক বিনিয়োগের ভিত্তি তৈরি করে।
মোশাররফ নিজে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পাননি। কিন্তু নিজের জীবনের অপূর্ণতাকে তিনি অন্যদের জন্য সুযোগ তৈরির অনুপ্রেরণায় পরিণত করেছেন।
ধানাদৌল ও আশপাশের এলাকায় একসময় মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ঘাটতি ছিল। স্কুল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হলেও জমি দেওয়ার মতো কেউ এগিয়ে আসছিলেন না। তখন মোশাররফ ঘোষণা করেন, বিদেশে শ্রম দিয়ে উপার্জিত অর্থ দিয়ে তিনি স্কুলের জন্য জমি কিনবেন।
১৯৮৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় তাঁর প্রথম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আবদুর রাজ্জাক খান চৌধুরী উচ্চ বিদ্যালয়—তাঁর প্রয়াত শিক্ষক বাবার নামে। প্রায় একশ শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠানটিতে এখন শিক্ষার্থী প্রায় এক হাজার। প্রতিষ্ঠানটি এমপিওভুক্ত হয়েছে এবং শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছেন ২৪ জন।
এরপর ১৯৯৯ সালে প্রতিষ্ঠা করেন মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ এবং আব্দুল মতিন খসরু মহিলা কলেজ। পাশাপাশি গড়ে তোলেন আশেনী-জোবেদা খান চৌধুরী ফোরকানিয়া মাদ্রাসা, মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী হাফেজিয়া মাদ্রাসা এবং মুমু-রোহান কিন্ডারগার্টেন।
সব মিলিয়ে ছয়টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখন একটি বৃহৎ জনপদের শিক্ষার সুযোগ তৈরি করছে।
মোশাররফের নামে প্রতিষ্ঠিত কলেজটি বর্তমানে চারতলা ভবনে পরিণত হয়েছে। সেখানে ১০টি বিষয়ে স্নাতক এবং একটি বিষয়ে মাস্টার্স পর্যায়ে পড়াশোনার সুযোগ রয়েছে। শিক্ষার্থী প্রায় পাঁচ হাজার। এইচএসসি ফলাফলের দিক থেকেও প্রতিষ্ঠানটি কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের সেরা কলেজগুলোর একটি হিসেবে অবস্থান করছে।
মোশাররফের প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সবকটিই এমপিওভুক্ত হয়েছে।
শিক্ষাকে শুধু শ্রেণিকক্ষের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি মোশাররফ। এলাকায় প্রতিষ্ঠা করেছেন আবদুর রাজ্জাক খান চৌধুরী লাইব্রেরি এবং ডা. মিজানুর রহমান চৌধুরী কিশোরী পাঠাগার।
ব্রাহ্মণপাড়া ডায়াবেটিক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার জন্য প্রায় দুই কোটি টাকা মূল্যের জমি দিয়েছেন তিনি। ঈদগাহ, কবরস্থান ও মসজিদের উন্নয়নেও তাঁর সহযোগিতা রয়েছে।
দরিদ্র পরিবারের সন্তানরা যেন অর্থের অভাবে পড়াশোনা থেকে ছিটকে না পড়ে, সে লক্ষ্যেও নিজের নামে ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেছেন। এ পর্যন্ত প্রায় ২০০ শিক্ষার্থী শিক্ষাবৃত্তি পেয়েছে। একই উদ্যোগে ১০টি গৃহহীন পরিবারকে ঘর করে দেওয়ার কথাও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্রে এসে মোশাররফের জীবনও সহজ ছিল না। নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজ করার পর রেস্তোরাঁ ও ফাস্টফুডের দোকানে কাজ করেছেন। ১৯৯২ সালে ট্যাক্সি চালানোর লাইসেন্স পাওয়ার পর নিউইয়র্কের রাস্তায় শুরু হয় তাঁর নতুন সংগ্রাম।
তারপর কেটে গেছে তিন দশকেরও বেশি সময়।
এই দীর্ঘ সময়ে উপার্জিত অর্থ দিয়ে তিনি নিজের জন্য বিলাসবহুল জীবন গড়ে তোলার পথ বেছে নেননি। বাড়ি, গাড়ি কিংবা ভোগ-বিলাসের পরিবর্তে জন্মভূমির মানুষের ভবিষ্যৎ নির্মাণকেই তিনি বড় করে দেখেছেন।
আর এ কারণেই তাঁর কাছে নিউইয়র্কের ট্যাক্সি শুধু জীবিকা নয়—এটি যেন তাঁর স্বপ্ন বাস্তবায়নের চলমান বাহন।
মোশাররফের জীবনযাপনেও রয়েছে ব্যতিক্রমী ত্যাগের গল্প। স্ত্রী ও সন্তানরা বাংলাদেশে থাকলেও তিনি তাঁদের যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসেননি। নিউইয়র্কে সাধারণ জীবনযাপন করেই কাটিয়ে দিচ্ছেন প্রবাসজীবন।
তাঁর যুক্তি খুব সরল—পরিবার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে থাকলে বাসাভাড়া ও জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়বে। সেই অর্থ বরং দেশের মানুষের কাজে লাগানোই তাঁর কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
এই দর্শনই তাঁকে অন্য অনেক প্রবাসীর চেয়ে আলাদা করে তুলেছে।
মোশাররফের মানবিকতার পরিধি শুধু শিক্ষা ও অবকাঠামো নির্মাণে সীমাবদ্ধ নয়। ধানাদৌল গ্রামের শ্রীশ্রী কালিমন্দির প্রাঙ্গণের শতবর্ষী একটি বটগাছের অস্তিত্ব রক্ষাতেও তিনি এগিয়ে এসেছিলেন।
২০০৭ সালে জরাজীর্ণ মন্দির সংস্কারের জন্য গাছটি বিক্রির উদ্যোগ নেওয়া হলে ৩৫ হাজার টাকায় বিক্রির কথাও ঠিক হয়। খবর পেয়ে নিউইয়র্ক থেকে মোশাররফ যোগাযোগ করেন ক্রেতার সঙ্গে। শেষ পর্যন্ত এক লাখ টাকা দিয়ে গাছটি নিজের করে নিয়ে সেটি মন্দির কর্তৃপক্ষকে দান করে দেন—শর্ত ছিল, গাছটি যেমন আছে তেমনই থাকবে।
আজও সেই বটগাছ মানুষের ছায়া দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
৬২ বছর বয়সেও মোশাররফ নিজেকে শিক্ষার্থী হিসেবে নতুন করে আবিষ্কার করছেন। উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে কলেজে স্নাতক পর্যায়ে পড়াশোনা করছেন তিনি।
তাঁর বিশ্বাস, শিক্ষার কোনো বয়স নেই।
নিজের জীবন দিয়ে তিনি যেন আরও একটি কথাও প্রমাণ করেছেন—শিক্ষা কেবল নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য নয়; শিক্ষা একটি পরিবার, একটি গ্রাম এমনকি একটি প্রজন্মের ভাগ্য বদলে দিতে পারে।
মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরীর গল্প তাই কেবল একজন প্রবাসীর সাফল্যের গল্প নয়। এটি ত্যাগের গল্প, দায়িত্ববোধের গল্প, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর গল্প এবং সবচেয়ে বড় কথা—নিজে যে সুযোগ পাননি, সেই সুযোগ অন্যদের করে দেওয়ার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
নিউইয়র্কের ব্যস্ত রাজপথে ট্যাক্সি চালাতে চালাতে তিনি প্রতিদিন হাজারো মানুষের গন্তব্যে পৌঁছে দেন। কিন্তু তাঁর নিজের সবচেয়ে বড় গন্তব্য যেন বহু দূরে—কুমিল্লার সেই মাটিতে, যেখানে তাঁর উপার্জনের অর্থে একের পর এক জ্বলে উঠেছে শিক্ষার আলো।
নিজের জীবনে শিক্ষার আলো কম পেয়েছিলেন; তাই অন্যের জীবনে আলো জ্বালিয়েই যেন নিজের অপূর্ণতার পূর্ণতা খুঁজে নিয়েছেন মোশাররফ।



















