নিউইয়র্কে মাটির গানের প্রথম সাধুসঙ্গ: লালন দর্শন, মানবতা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনায় মুখর সাউথ ওজন পার্ক
প্রজ্ঞা নিউজ ডেস্ক, নিউইয়র্ক:
প্রবাসের ব্যস্ত জীবনে বাঙালির মাটি, মানুষ ও শেকড়ের সংস্কৃতিকে ধারণ করে নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত হলো ‘মাটির গান’-এর প্রথম সাধুসঙ্গ। লালন সাঁইজির গান, মানবতাবাদী দর্শন, অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও লোকসংস্কৃতির আবহে আয়োজিত এ সাধুসঙ্গ পরিণত হয় বাঙালি সংস্কৃতির এক প্রাণবন্ত মিলনমেলায়।
গত ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, রবিবার রাত ৮টায় নিউইয়র্কের সাউথ ওজন পার্কে সংগঠনের সদস্যদের বাসভবনে এ আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়। মঙ্গলপ্রদীপ প্রজ্বালনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন উপমহাদেশের খ্যাতিসম্পন্ন তবলা শিল্পী ও বীর মুক্তিযোদ্ধা দেবু চৌধুরী, বাংলাদেশ উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী যুক্তরাষ্ট্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক কল্লোল দাশ, প্রজ্ঞা নিউজের নির্বাহী সম্পাদক ও আবৃত্তিশিল্পী মুনমুন সাহা , বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কাজী জালাল এবং সংগীতশিল্পী সূপর্ণা সরকার রিমি।
অনুষ্ঠানের শুরুতে শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন ‘মাটির গান’-এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও পরিচালক, বাংলাদেশ ও নিউইয়র্কের জননন্দিত বাউলশিল্পী মো. শাহীন হোসেন। পরে উপস্থিত অতিথিদের উত্তরীয় পরিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানানো হয়।
সাধুসঙ্গের মূল আকর্ষণ ছিল ফকির লালন সাঁইজির গান। ‘মাটির গান’-এর পরিকল্পনা ও পরিচালনায় লালনের মানবতাবাদী দর্শন, প্রেম, সাম্য ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার গান পরিবেশন করেন খৃষ্টিলা কুইয়া, তুলি বিশ্বাস, মলি ডেসা ও মহুয়া ভট্টাচার্য। তবলায় ছিলেন উপমহাদেশের খ্যাতিমান শিল্পী দেবু চৌধুরী, কিবোর্ডে রবিউল ইসলাম এবং পারকেশনে সুমন। অতিথি শিল্পী হিসেবে সংগীত পরিবেশন করেন সূপর্ণা সরকার রিমি। এছাড়াও সংগীত পরিবেশন করেন কবিতা সরকার।
লালন সাধনার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো মানুষের মধ্যে বিভেদ নয়, বরং মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখার শিক্ষা। জাতপাত, ধর্মীয় বিভাজন ও সামাজিক বৈষম্যের ঊর্ধ্বে উঠে মানবমুক্তি ও মানবিক মর্যাদার কথা বলে লালনের দর্শন। সেই দর্শনকে প্রবাসের নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার পাশাপাশি বাংলা লোকসংগীত ও বাউল সংস্কৃতিকে আন্তর্জাতিক নগরী নিউইয়র্কে আরও বিস্তৃত করার প্রত্যয়ও উঠে আসে এই সাধুসঙ্গে।
আয়োজকদের মতে, প্রবাসে বসবাস করলেও শেকড়ের সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখা এবং নতুন প্রজন্মকে বাংলার লোকঐতিহ্য, বাউলগান ও মানবিক মূল্যবোধের সঙ্গে পরিচিত করানো জরুরি। ‘মাটির গান’-এর এই আয়োজন সেই সাংস্কৃতিক দায়িত্ব পালনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রয়াস।
সার্বিক ব্যবস্থাপনায় ছিলেন অমিত বিশ্বাস ও জসিম উদ্দিন। তাঁদের আন্তরিক প্রচেষ্টা ও উপস্থিত শিল্পী-অতিথিদের অংশগ্রহণে পুরো অনুষ্ঠানটি হয়ে ওঠে ঘরোয়া অথচ গভীর সাংস্কৃতিক তাৎপর্যপূর্ণ।
অনুষ্ঠানের শেষপর্বে ছিল মনোরম পরিবেশে আন্তরিক আড্ডা ও সুস্বাদু খাবারের আপ্যায়ন। গান, দর্শন, সংস্কৃতি ও পারস্পরিক সৌহার্দ্যের আবহে প্রথম সাধুসঙ্গের সমাপ্তি ঘটে।
নিউইয়র্কে নানা ধরনের সাংস্কৃতিক আয়োজনের ভিড়ে ‘মাটির গান’-এর এই সাধুসঙ্গ বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। কারণ এটি শুধু গান শোনার আয়োজন নয়—বরং লালন দর্শনের মানবিক বাণী, বাংলার লোকঐতিহ্য এবং অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতিকে প্রবাসের মাটিতে নতুন করে ধারণ করার এক সাংস্কৃতিক প্রয়াস।



















