কর্মফল একদিন ফিরেই আসে, ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়: অন্যের ক্ষতি করে কেউ চিরকাল পার পায় না; সময়ের বিচারে মানুষের কর্মই হয়ে ওঠে তার সবচেয়ে বড় পরিচয়
উত্তম কুমার সাহা:
মানুষের জীবনে ক্ষমতা, অর্থ, প্রতিপত্তি কিংবা সামাজিক অবস্থান কখনোই চিরস্থায়ী নয়। সময়ের সঙ্গে সবকিছুর পরিবর্তন ঘটে। আজ যিনি ক্ষমতার শীর্ষে, কাল তাঁকেই হয়তো কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়। আজ যিনি অন্যের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করছেন, সময়ের আবর্তে তাঁকেও পরিস্থিতির কাছে অসহায় হয়ে পড়তে হতে পারে। তাই ক্ষমতা ও প্রভাবের দম্ভে অন্যকে ছোট করা, কারও অধিকার কেড়ে নেওয়া কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে অন্যের ক্ষতি করার আগে মনে রাখা উচিত—মানুষ তার কাজের দায় এড়াতে পারে না।
কর্মফল জীবনের এক চিরন্তন শিক্ষা। মানুষ যা করে, তার প্রভাব কোনো না কোনোভাবে তার জীবন, সম্পর্ক ও সামাজিক অবস্থানে ফিরে আসে। অন্যের জন্য সম্মান, সহানুভূতি ও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলে তার সুফল সমাজে ছড়িয়ে পড়ে। বিপরীতে, অন্যায়, প্রতারণা, অবিচার ও মানুষের ক্ষতি করার প্রবণতা একসময় বিশ্বাস নষ্ট করে, সম্পর্ক ভেঙে দেয় এবং মানুষের মর্যাদাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে।
কেউ হয়তো সাময়িকভাবে ক্ষমতার জোরে অন্যায় করে পার পেয়ে যায়। তার চারপাশে তখন প্রশংসাকারী মানুষের ভিড় থাকে, সিদ্ধান্তে বাধা দেওয়ার সাহস কেউ দেখায় না। কিন্তু সেই নীরবতাকে মানুষের সমর্থন ভেবে ভুল করা উচিত নয়। অনেক সময় মানুষ পরিস্থিতির কারণে চুপ থাকে, কিন্তু মনে রাখে কে তার পাশে দাঁড়িয়েছিল, আর কে তার দুর্দিনের সুযোগ নিয়ে ক্ষতি করেছিল।
সময়ের পরিবর্তন হলে সেই নীরব মানুষগুলোর অবস্থানও বদলে যেতে পারে। তখন ক্ষমতার দাপট নয়, মানুষের অতীত আচরণই হয়ে ওঠে মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি। ইতিহাসের দিকে তাকালেই দেখা যায়, ক্ষমতা ও প্রতিপত্তির অধিকারী অনেকেই সময়ের পরিবর্তনে বিস্মৃত হয়েছেন। আবার যাঁরা মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন, ন্যায়ের পক্ষে থেকেছেন এবং বিপদে মানুষের হাত ধরেছেন, তাঁরা মানুষের হৃদয়ে স্মরণীয় হয়ে আছেন।
আমাদের মনে রাখা দরকার, প্রতিশোধ আর কর্মফল এক বিষয় নয়। অন্যায়ের প্রতিশোধ নেওয়ার আকাঙ্ক্ষা মানুষকে আরও অন্যায়ের দিকে ঠেলে দিতে পারে। কিন্তু ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, অন্যায়ের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া একটি সভ্য সমাজের দায়িত্ব। কেউ অন্যায় করলে তার বিচার হওয়া উচিত আইন, প্রমাণ ও ন্যায়সংগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। ব্যক্তিগত বিদ্বেষ নয়, ন্যায়বিচারই হোক আমাদের প্রত্যাশা।
ক্ষমতার প্রকৃত অর্থ অন্যকে ভয় দেখানো নয়, বরং মানুষের সেবা করা। নেতৃত্বের সার্থকতা বিরোধীদের দমন করার মধ্যে নয়, বরং ভিন্নমতকে সম্মান করা, দুর্বল মানুষের অধিকার রক্ষা করা এবং নিজের দায়িত্ব সততার সঙ্গে পালন করার মধ্যে। যে ব্যক্তি ক্ষমতাকে মানুষের কল্যাণের পরিবর্তে ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার করেন, তিনি হয়তো সাময়িক সুবিধা লাভ করতে পারেন, কিন্তু তাঁর কাজের নৈতিক ও সামাজিক পরিণতি এড়ানো কঠিন।
প্রকৃতির নিয়মেও পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী। নদীর এ কূল ভাঙে, ও কূল গড়ে। যে তীর আজ শক্ত ও অটুট বলে মনে হয়, কাল তা নদীর স্রোতে বিলীন হতে পারে। আবার যে ভূমি আজ ভাঙনের মুখে, সেখানেই সময়ের ব্যবধানে নতুন চর জেগে উঠতে পারে। মানুষের জীবন, ক্ষমতা ও অবস্থানের পরিবর্তনও অনেকটা এমনই। আজকের সুদিন চিরকাল থাকবে—এমন নিশ্চয়তা কারও নেই। একইভাবে আজকের দুর্দিনও চিরস্থায়ী নয়।
এই বাস্তবতা আমাদের অহংকার ত্যাগ করতে শেখায়। কাউকে দুর্বল ভেবে অবহেলা করা, কারও অসহায়ত্বের সুযোগ নেওয়া কিংবা নিজের অবস্থানকে চিরস্থায়ী মনে করা আত্মপ্রবঞ্চনা ছাড়া আর কিছু নয়। কারণ সময় কখন কার পক্ষে দাঁড়াবে, তা আগাম বলা যায় না।
সবচেয়ে বড় কথা, আমরা মানুষ। আমাদের বিবেক আছে, বিচারবুদ্ধি আছে, ভালো-মন্দ বোঝার ক্ষমতা আছে। সেই বিবেককে বিসর্জন দিয়ে অন্যের ক্ষতি করে নিজের সাফল্য প্রতিষ্ঠা করা প্রকৃত সাফল্য হতে পারে না। মানুষের প্রকৃত পরিচয় তার পদ-পদবি, অর্থসম্পদ কিংবা ক্ষমতার পরিমাণে নির্ধারিত হয় না; নির্ধারিত হয় তার আচরণ, সততা, মানবিকতা এবং অন্য মানুষের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিতে।
তাই জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে মনে রাখা উচিত—কাউকে কষ্ট দেওয়ার আগে, কারও অধিকার নষ্ট করার আগে এবং ক্ষমতার দম্ভে অন্যায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে একবার নিজের বিবেককে প্রশ্ন করা প্রয়োজন। আজ যে অন্যায় অন্যের সঙ্গে করছি, কাল তার পরিণতি আমার জীবনেও কোনো না কোনোভাবে প্রভাব ফেলতে পারে।
শেষ পর্যন্ত ক্ষমতা থাকে না, পদ-পদবি থাকে না, দম্ভও থাকে না। থেকে যায় মানুষের কর্ম, আচরণ এবং তার রেখে যাওয়া স্মৃতি। নদীর এ কূল ভেঙে ও কূল গড়ে, সময়ও তেমনি মানুষের অবস্থান বদলে দেয়। তাই অন্যের ক্ষতি করে নয়, মানুষের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করেই জীবনের সার্থকতা খুঁজতে হবে। কারণ ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়, কিন্তু কর্মের ছাপ মানুষের জীবনে ও ইতিহাসে দীর্ঘদিন থেকে যায়।



















