Logo

সাহিত্য সংস্কৃতি    >>   মা দুর্গা আসেন শক্তি, সাম্য ও মানবতার বার্তা নিয়ে: অশুভের বিনাশ, শুভশক্তির জাগরণ এবং অসাম্প্রদায়িক মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠাই হোক শারদীয় দুর্গোৎসবের অঙ্গীকার

মা দুর্গা আসেন শক্তি, সাম্য ও মানবতার বার্তা নিয়ে: অশুভের বিনাশ, শুভশক্তির জাগরণ এবং অসাম্প্রদায়িক মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠাই হোক শারদীয় দুর্গোৎসবের অঙ্গীকার

মা দুর্গা আসেন শক্তি, সাম্য ও মানবতার বার্তা নিয়ে: অশুভের বিনাশ, শুভশক্তির জাগরণ এবং অসাম্প্রদায়িক মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠাই হোক শারদীয় দুর্গোৎসবের অঙ্গীকার

উত্তম কুমার সাহা:

শরতের নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা, কাশফুলের দোলায় দোলায় প্রকৃতির অনাবিল আনন্দ, শিউলি ফুলের স্নিগ্ধ সুবাস আর ঢাকের মাদকতাময় শব্দে যখন চারপাশ মুখর হয়ে ওঠে, তখন বাঙালির হৃদয়ে জেগে ওঠে এক চিরন্তন আবেগ—মা দুর্গার আগমনী বার্তা। দুর্গাপূজা শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি বাঙালির আত্মপরিচয়, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, অসাম্প্রদায়িক চেতনা এবং মানবিক মূল্যবোধের এক অনন্য সম্মিলন। মা দুর্গার আবির্ভাব আমাদের মনে করিয়ে দেয়, অশুভ যত শক্তিশালীই হোক না কেন, শুভশক্তির ঐক্য, সাহস ও ন্যায়ের কাছে তার পরাজয় অনিবার্য।

মা দুর্গা শক্তির প্রতীক, সাহসের প্রতীক, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রতীক। তাঁর দশ হাতে ধারণ করা অস্ত্র কেবল পৌরাণিক শক্তির প্রকাশ নয়, বরং অন্যায়, অবিচার, অহংকার, হিংসা ও অমানবিকতার বিরুদ্ধে মানুষের সম্মিলিত প্রতিরোধের প্রতীকী ভাষা। মহিষাসুরের বিরুদ্ধে দেবী দুর্গার বিজয় আমাদের শিক্ষা দেয়, অশুভের বিরুদ্ধে সংগ্রাম কখনো থামিয়ে দেওয়া যায় না। সত্য ও ন্যায়ের পথে অবিচল থেকে সাহসের সঙ্গে এগিয়ে যেতে হয়। যে সমাজ অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে জানে, যে মানুষ দুর্বলের পাশে হাত বাড়িয়ে দিতে পারে, যে হৃদয় পরের দুঃখে ব্যথিত হয়—সেখানেই শুভশক্তির প্রকৃত জাগরণ ঘটে।

কিন্তু আজকের পৃথিবীর দিকে তাকালে প্রশ্ন জাগে, আমরা কি সত্যিই মায়ের আদর্শকে আমাদের জীবনে ধারণ করতে পেরেছি? চারদিকে যখন হিংসা, বিদ্বেষ, ধর্মীয় বিভাজন, বৈষম্য, নারী নির্যাতন, দুর্নীতি এবং ক্ষমতার দম্ভ মানুষের স্বাভাবিক জীবনকে বিপন্ন করে তোলে, তখন শুধু আলোকসজ্জা, প্রতিমার সৌন্দর্য কিংবা উৎসবের জাঁকজমকের মধ্যে দুর্গাপূজার প্রকৃত তাৎপর্য সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। মায়ের পূজা তখনই সার্থক হবে, যখন আমরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করব, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াব, নারীর মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সচেতন হব এবং প্রতিটি মানুষের মৌলিক অধিকার রক্ষায় অঙ্গীকারবদ্ধ থাকব।

দেবী দুর্গার আরাধনার অন্তর্নিহিত শক্তি আমাদের শেখায়, নারীর মধ্যে রয়েছে সৃষ্টির ক্ষমতা, সাহস, আত্মমর্যাদা এবং প্রতিকূলতাকে জয় করার অসীম সামর্থ্য। অথচ আধুনিক সমাজেও নারীকে যখন বৈষম্য, সহিংসতা ও অবহেলার শিকার হতে হয়, তখন দুর্গাপূজার আনন্দের পাশাপাশি আত্মসমালোচনারও প্রয়োজন দেখা দেয়। যে সমাজ প্রতিমার সামনে নারীশক্তির বন্দনা করে, সেই সমাজকেই বাস্তব জীবনে নারীর স্বাধীনতা, সম্মান, নিরাপত্তা ও সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। কেবল মায়ের পায়ে ফুল দিলেই হবে না, প্রতিটি নারীর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের মধ্য দিয়েই আমাদের পূজা পূর্ণতা পাবে।

দুর্গোৎসবের আরেকটি বড় শিক্ষা হলো ঐক্য। পূজামণ্ডপে ধনী-গরিব, ছোট-বড়, পরিচিত-অপরিচিত মানুষের মিলন ঘটে। উৎসবের আনন্দ ভাগাভাগি করে নেওয়ার মধ্য দিয়ে তৈরি হয় সম্প্রীতির বন্ধন। বাঙালির চিরায়ত সংস্কৃতি কখনো সংকীর্ণতার শিক্ষা দেয়নি; বরং দিয়েছে পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা, সহমর্মিতা ও ভালোবাসার শিক্ষা। ধর্ম যার যার, উৎসবের আনন্দ সবার—এই চেতনাই হোক আমাদের সামাজিক জীবনের অন্যতম ভিত্তি। ধর্মীয় পরিচয় যেন কখনো মানুষের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করতে না পারে। বিশ্বাসের ভিন্নতা থাকলেও মানবিক মর্যাদা, ন্যায়বিচার ও শান্তির প্রশ্নে আমরা সবাই এক।

আজ যখন পৃথিবীর নানা প্রান্তে ধর্মীয় বিদ্বেষ, জাতিগত সংঘাত এবং অসহিষ্ণুতা মানুষের শান্তি ও নিরাপত্তাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে, তখন মা দুর্গার আবির্ভাব নতুন করে মানবতার আহ্বান জানায়। অশুভশক্তির বিরুদ্ধে বিজয় শুধু পৌরাণিক কাহিনির বিষয় নয়; এটি প্রতিদিনের জীবনে সত্যকে প্রতিষ্ঠা করা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে দাঁড়ানো, নিপীড়িত মানুষের কণ্ঠস্বরকে সম্মান করা এবং বৈষম্যহীন সমাজ গড়ে তোলার সংগ্রাম। যে শিশু ক্ষুধার্ত, যে পরিবার নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে, যে মানুষ ধর্ম বা পরিচয়ের কারণে নিপীড়িত হয়, যে অসহায় ব্যক্তি ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়—তাদের পাশে দাঁড়ানোই মানবতার সবচেয়ে বড় পূজা।

প্রবাসে বসবাসকারী বাঙালিদের কাছে দুর্গাপূজার আবেগ আরও গভীর, আরও স্মৃতিময়। হাজার মাইল দূরে থেকেও শরতের আগমন তাদের মনে ফিরিয়ে আনে শৈশবের দিন, গ্রামের পূজামণ্ডপ, ঢাকের শব্দ, নতুন পোশাক, আত্মীয়স্বজনের মিলন এবং বিজয়ার মিষ্টিমুখ। নিউইয়র্কসহ বিশ্বের বিভিন্ন শহরে প্রবাসী বাঙালিরা যখন দুর্গোৎসবের আয়োজন করেন, তখন তা শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান থাকে না; হয়ে ওঠে বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার এক গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। প্রবাসের মাটিতে এই উৎসব প্রমাণ করে, ভৌগোলিক দূরত্ব মানুষের শিকড়কে বিচ্ছিন্ন করতে পারে না। মাতৃভূমি থেকে দূরে থেকেও বাঙালি তার সংস্কৃতি, ভাষা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে হৃদয়ে ধারণ করে রাখতে পারে।

তবে প্রবাসে কিংবা স্বদেশে, উৎসবের প্রকৃত সৌন্দর্য তখনই বিকশিত হয়, যখন আনন্দের পাশাপাশি সামাজিক দায়িত্ববোধও জাগ্রত থাকে। পূজার আয়োজনে অপচয়ের পরিবর্তে দরিদ্র মানুষের সহায়তা, প্রবীণদের প্রতি যত্ন, শিশুদের কল্যাণ, পরিবেশের সুরক্ষা এবং সামাজিক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। উৎসবের আলো যদি কোনো অসহায় মানুষের ঘরেও আশার প্রদীপ জ্বালাতে পারে, তবে সেই আনন্দের অর্থ বহুগুণ বেড়ে যায়। মায়ের আরাধনা তখন মন্দিরের গণ্ডি ছাড়িয়ে মানুষের জীবনে পৌঁছে যায়।

দুর্গাপূজার শেষ দিনে যখন বিসর্জনের সুর বেজে ওঠে, তখন ভক্তের চোখে জল আসে। প্রতিমা বিদায় নেন, কিন্তু মায়ের আদর্শ, শক্তি ও আশীর্বাদের প্রত্যাশা মানুষের হৃদয়ে থেকে যায়। এই বিদায় আসলে বিচ্ছেদের নয়, বরং নতুন করে জেগে ওঠার আহ্বান। মা ফিরে যান কৈলাসে, কিন্তু রেখে যান সাহসের শিক্ষা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর প্রেরণা এবং ভালোবাসার বন্ধনে মানুষকে এক করার বার্তা। তাই বিসর্জনের অশ্রুর মধ্যেও উচ্চারিত হয় আগামী বছরের প্রতীক্ষা—আবার এসো মা।

আমাদের প্রার্থনা, মা দুর্গার আগমনে পৃথিবী থেকে দূর হোক হিংসা, বিদ্বেষ ও অমানবিকতা। ধর্মীয় সংখ্যালঘু, নারী, শিশু, প্রবীণ এবং সমাজের সব প্রান্তিক মানুষের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত হোক। সত্যের বিজয় প্রতিষ্ঠিত হোক, ন্যায়বিচার হোক সবার অধিকার, মানবিকতা হোক মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয়। যে হাতে আমরা মায়ের চরণে ফুল অর্পণ করি, সেই হাত যেন বিপন্ন মানুষের সাহায্যে এগিয়ে আসে। যে কণ্ঠে আমরা আগমনী গান গাই, সেই কণ্ঠ যেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সোচ্চার হয়। যে হৃদয়ে আমরা দেবীকে স্থান দিই, সেই হৃদয়ে যেন প্রতিটি মানুষের জন্য ভালোবাসা ও সহমর্মিতা থাকে।

মা দুর্গা আমাদের শেখান, অন্ধকার যত গভীরই হোক, আলোর সম্ভাবনা কখনো নিঃশেষ হয় না। অন্যায় যত প্রবলই হোক, ন্যায়ের পক্ষে মানুষের সম্মিলিত শক্তি তাকে পরাজিত করতে পারে। তাই এবারের শারদীয় দুর্গোৎসব হোক শুধু আনন্দ-উৎসব নয়, আত্মশুদ্ধি, সামাজিক দায়িত্ববোধ, সম্প্রীতি ও মানবিক জাগরণের উৎসব। আসুন, মায়ের কাছে শুধু ব্যক্তিগত সুখ-সমৃদ্ধি নয়, সমগ্র পৃথিবীর শান্তি, মানুষের নিরাপত্তা এবং বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রার্থনা করি।

এসো মা দুর্গা, শক্তি হয়ে জাগো প্রতিটি প্রাণে, আলো হয়ে জ্বলো অন্ধকারের অবসানে। অশুভের বিনাশ হোক, শুভশক্তির জয় হোক, ধর্ম-বর্ণের বিভেদ ভুলে মানুষে মানুষে ভালোবাসার বন্ধন অটুট থাকুক। পৃথিবী ভরে উঠুক শান্তি, সাম্য, সম্প্রীতি ও মানবতার আলোয়।
শুভ শারদীয়া। জয় মা দুর্গা।
উত্তম কুমার সাহা 
সম্পাদক ও প্রকাশক 
প্রজ্ঞা নিউজ।