বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য হান্নান শাহের ১০ম মৃত্যুবার্ষিকী আজ
প্রজ্ঞা নিউজ ডেস্ক:
বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সাবেক সদস্য, সাবেক পাটমন্ত্রী ও অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আ স ম হান্নান শাহের ১০ম মৃত্যুবার্ষিকী আজ রোববার, ২৭ সেপ্টেম্বর। ২০১৬ সালের এই দিনে সিঙ্গাপুরের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন। তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার ঘাগটিয়া গ্রামের পৈতৃক বাড়িতে দিনব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।
হান্নান শাহ স্মৃতি সংসদ, তাঁর পরিবার ও বিএনপির পক্ষ থেকে মরহুমের রুহের মাগফিরাত কামনায় কোরআনখানি, মিলাদ মাহফিল ও বিশেষ দোয়ার আয়োজন করা হয়েছে। এসব কর্মসূচিতে পরিবারের সদস্য, বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মী, শুভানুধ্যায়ী ও এলাকাবাসী অংশ নেবেন। মৃত্যুবার্ষিকীতে বিএনপির নেতাকর্মীরা দলের প্রতি তাঁর দীর্ঘদিনের অবদান, রাজনৈতিক দৃঢ়তা এবং কাপাসিয়ার উন্নয়নে তাঁর ভূমিকা স্মরণ করছেন।
১৯৪১ সালের ১১ অক্টোবর গাজীপুর জেলার কাপাসিয়া উপজেলার ঘাগটিয়া ইউনিয়নের ঘাগটিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন আ স ম হান্নান শাহ। তাঁর পিতা ফকির আব্দুল মান্নান পাকিস্তান আমলের একজন মন্ত্রী এবং বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ছিলেন। পারিবারিক ঐতিহ্য, সামরিক পেশায় দীর্ঘ অভিজ্ঞতা এবং পরবর্তী সময়ে সক্রিয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে হান্নান শাহ দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নিজস্ব পরিচিতি গড়ে তোলেন।
শিক্ষাজীবনে তিনি ঢাকার সেন্ট গ্রেগরিজ স্কুলে পড়াশোনা করেন এবং ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করেন। পরবর্তী সময়ে বিজ্ঞান বিষয়ে অধ্যয়নকালে ১৯৬০ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। ১৯৬২ সালে পাকিস্তানের কাকুলে অবস্থিত সামরিক একাডেমি থেকে কমিশন লাভ করেন। দীর্ঘ সামরিক জীবনে বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করে তিনি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পদে উন্নীত হন। ১৯৮৩ সালে তৎকালীন এরশাদ সরকারের সময় তাঁকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়।
সামরিক বাহিনী থেকে অবসরের পর হান্নান শাহ সরকারি প্রশাসন ও উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন। তিনি বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তী সময়ে বিএনপিতে যোগ দিয়ে সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। দলীয় সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে দক্ষতা, নেতৃত্ব এবং রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে তিনি দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের একজন হয়ে ওঠেন।
১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গাজীপুর-৪ (কাপাসিয়া) আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। বিএনপি সরকারের সময় তিনি পাট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি নিজ নির্বাচনী এলাকার যোগাযোগব্যবস্থা, শিক্ষা ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে ভূমিকা রাখেন। পরবর্তী সময়ে তিনি বিএনপির ঢাকা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক, গাজীপুর জেলা বিএনপির সভাপতি এবং বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তাঁর সক্রিয় ভূমিকার স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য করা হয়।
২০০৭-২০০৮ সালের সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় বিএনপির রাজনীতিতে হান্নান শাহের ভূমিকা বিশেষভাবে আলোচিত হয়। ওই সময় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার প্রতি সমর্থন এবং দলের শীর্ষ নেতৃত্বের রাজনৈতিক অবস্থানের পক্ষে তিনি প্রকাশ্যে বক্তব্য দেন। খালেদা জিয়াকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করা এবং শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরতে বাধা দেওয়ার উদ্যোগের বিরুদ্ধেও তিনি সমালোচনা করেন। জরুরি অবস্থার সময় বিএনপির সাংগঠনিক কার্যক্রম সচল রাখা এবং দলের নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ করার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা দলীয় মহলে গুরুত্ব পায়। এ সময় তাঁকে গ্রেপ্তারও হতে হয়েছিল।
রাজনীতির পাশাপাশি নিজ জন্মভূমি কাপাসিয়ার উন্নয়নে হান্নান শাহের ভূমিকা স্থানীয় মানুষের কাছে স্মরণীয় হয়ে আছে। তাঁর উদ্যোগে এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ, মাদরাসা, সড়ক ও যোগাযোগ অবকাঠামোর উন্নয়নে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়। স্থানীয় পর্যায়ে মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রাখা এবং এলাকার সমস্যা সমাধানে ভূমিকা রাখার কারণে তিনি কাপাসিয়ার বিএনপি নেতাকর্মী ও সমর্থকদের কাছে অভিভাবকতুল্য নেতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
কাপাসিয়ার শীতলক্ষ্যা নদীর ওপর নির্মিত ফকির মজনু শাহ সেতু এলাকার যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। নদীবেষ্টিত এলাকার মানুষের যাতায়াত, ব্যবসা-বাণিজ্য ও দৈনন্দিন যোগাযোগ সহজ করার ক্ষেত্রে সেতুটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। হান্নান শাহের রাজনৈতিক জীবনের সঙ্গে এই অবকাঠামোগত উন্নয়নের স্মৃতি স্থানীয়ভাবে জড়িয়ে রয়েছে।
২০১৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর অসুস্থ হয়ে পড়লে হান্নান শাহকে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) ভর্তি করা হয়। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য ১১ সেপ্টেম্বর তাঁকে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়। সেখানে র্যাফেলস হার্ট সেন্টারে তাঁর হৃদ্যন্ত্রের অস্ত্রোপচার করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৬ সালে ৭৪ বছর বয়সে তিনি শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন।
তাঁর মরদেহ দেশে আনার পর ঢাকায় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা, বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ বিভিন্ন স্থানে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে গাজীপুরের কাপাসিয়ার ঘাগটিয়া গ্রামে পারিবারিক কবরস্থানে পিতার কবরের পাশে তাঁকে দাফন করা হয়। তাঁর জানাজায় রাজনৈতিক নেতাকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।
হান্নান শাহের রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল সামরিক বাহিনীর অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে পরবর্তী সময়ে দলীয় সংগঠন ও সংসদীয় রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন। বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তাঁর অবস্থান, রাজনৈতিক সংকটে দলের প্রতি আনুগত্য এবং কাপাসিয়ার উন্নয়নে তাঁর উদ্যোগ তাঁকে দলীয় রাজনীতিতে স্বতন্ত্র পরিচিতি দিয়েছে।
তাঁর ১০ম মৃত্যুবার্ষিকীতে পরিবারের সদস্য, রাজনৈতিক সহকর্মী, বিএনপির নেতাকর্মী ও কাপাসিয়ার সাধারণ মানুষ মরহুমের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন। কোরআনখানি, মিলাদ ও দোয়া মাহফিলের মধ্য দিয়ে তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করা হচ্ছে।
রাজনীতির অঙ্গনে তাঁর দীর্ঘ পথচলা, দলের দুঃসময়ে সক্রিয় ভূমিকা এবং নিজ এলাকার উন্নয়নে অবদান তাঁকে স্মরণীয় করে রেখেছে। কাপাসিয়ার মানুষের কাছে আ স ম হান্নান শাহ শুধু একজন সাবেক মন্ত্রী বা রাজনৈতিক নেতা নন, তিনি এলাকার উন্নয়ন ও রাজনৈতিক ইতিহাসেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম।
সূত্র: আকরাম হোসেন রিপন।



















