Logo

আন্তর্জাতিক    >>   অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক: সর্বজনীন গণতন্ত্র ও মানবমুক্তির দর্শন

অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক: সর্বজনীন গণতন্ত্র ও মানবমুক্তির দর্শন

অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক: সর্বজনীন গণতন্ত্র ও মানবমুক্তির দর্শন

এম এ আলীম সরকার:

৩০ সেপ্টেম্বর অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের ৮৭তম জন্মদিন। ১৯৪০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর কিশোরগঞ্জ জেলার পাকুন্দিয়া উপজেলার পাকুন্দিয়া গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত পণ্ডিত পরিবারে তাঁর জন্ম। তাঁর জন্মদিন কেবল একজন জ্ঞানতাপস, শিক্ষক, লেখক ও রাষ্ট্রচিন্তকের জীবন ও কর্ম স্মরণ করার উপলক্ষ নয়; এটি মানুষের মুক্তি, ন্যায়বিচার, সর্বজনীন গণতন্ত্র এবং শোষণ-বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন নিয়ে নতুন করে ভাবারও একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়।

অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক বাংলাদেশের একজন বিশিষ্ট চিন্তাবিদ, প্রাবন্ধিক, গবেষক, শিক্ষক, দার্শনিক ও রাষ্ট্রচিন্তক। বাংলা ভাষা, সাহিত্য, রাজনীতি, সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা নিয়ে তাঁর দীর্ঘদিনের চিন্তা ও লেখালেখি বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরে গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছে। প্রচলিত রাজনৈতিক ধারণাকে প্রশ্ন করা, রাষ্ট্রের চরিত্র বিশ্লেষণ করা এবং সাধারণ মানুষের অধিকার ও মর্যাদাকে রাজনৈতিক চিন্তার কেন্দ্রে স্থাপন করা তাঁর চিন্তাচর্চার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

তাঁর রাষ্ট্রচিন্তার কেন্দ্রে রয়েছে মানুষ—বিশেষ করে কৃষক, শ্রমিক, মজলুম, মেহনতি ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠী। ক্ষমতার রাজনীতি, দলীয় স্বার্থ কিংবা নির্বাচনী হিসাব-নিকাশের বাইরে গিয়ে তিনি রাষ্ট্র ও রাজনীতির মৌলিক উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর চিন্তার গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধান হলো, রাষ্ট্রের ক্ষমতা কার স্বার্থে ব্যবহৃত হচ্ছে, অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুফল কারা পাচ্ছে এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সাধারণ মানুষের অধিকার কতটা প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে।

তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিতে, শুধু সরকার পরিবর্তন কিংবা নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার পালাবদল ঘটলেই মানুষের প্রকৃত মুক্তি নিশ্চিত হয় না। এর জন্য প্রয়োজন রাষ্ট্রের নীতি, অর্থনৈতিক কাঠামো, রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থায় এমন পরিবর্তন, যার সুফল সাধারণ মানুষের জীবনে বাস্তবভাবে প্রতিফলিত হবে। যে ব্যবস্থায় মানুষ ভোট দেওয়ার অধিকার পেলেও জীবিকার নিরাপত্তা, শিক্ষা, চিকিৎসা, কর্মসংস্থান ও ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত থাকে, সেই ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা জরুরি।

এই চিন্তার ধারাবাহিকতায় তাঁর সর্বজনীন গণতন্ত্রের ধারণা বিশেষভাবে আলোচনার দাবি রাখে। এই ধারণার মূল তাৎপর্য হলো, গণতন্ত্রকে কেবল নির্বাচন, দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা কিংবা ক্ষমতা হস্তান্তরের আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে জনগণের সামগ্রিক অধিকার, মর্যাদা, অংশগ্রহণ ও কল্যাণের সঙ্গে যুক্ত করা। গণতন্ত্রের প্রকৃত তাৎপর্য তখনই উপলব্ধি করা যায়, যখন রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও উন্নয়নের সুফল সাধারণ মানুষের জীবনকে ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে।

একটি রাষ্ট্রে নাগরিকের রাজনৈতিক অধিকার যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ তাঁর অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তা। কৃষক তাঁর উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য পাবেন, শ্রমিক তাঁর শ্রমের যথাযথ মর্যাদা ও ন্যায্য পারিশ্রমিক পাবেন, বেকার যুবকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং প্রত্যেক নাগরিক ন্যায়বিচার ও সমান মর্যাদা লাভ করবেন—গণতন্ত্রের সঙ্গে এসব প্রশ্নের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। এই বৃহত্তর দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের রাষ্ট্রচিন্তা ও সর্বজনীন গণতন্ত্রের ধারণা মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

তাঁর চিন্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রচলিত রাজনৈতিক সংস্কৃতির সমালোচনা। রাজনীতি যদি কেবল ক্ষমতা অর্জন, দলীয় আধিপত্য বিস্তার কিংবা ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠীগত স্বার্থ সংরক্ষণের হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তাহলে সাধারণ মানুষের মুক্তির প্রশ্ন আড়ালে পড়ে যায়। অথচ রাজনীতির মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত মানুষের জীবনকে নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও ন্যায়ভিত্তিক করা। কৃষকের ঘাম, শ্রমিকের শ্রম, মেহনতি মানুষের জীবনসংগ্রাম এবং সাধারণ মানুষের স্বপ্নকে উপেক্ষা করে একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা কঠিন।

আজকের বাংলাদেশে অর্থনৈতিক বৈষম্য, কর্মসংস্থানের সংকট, দুর্নীতি, দ্রব্যমূল্যের চাপ, রাজনৈতিক বিভাজন এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে যে প্রশ্নগুলো সামনে আসে, সেগুলোর আলোচনায় তাঁর রাষ্ট্রচিন্তা প্রাসঙ্গিকভাবে বিবেচিত হতে পারে। এসব সমস্যার সমাধান কোনো একক ব্যক্তি, দল কিংবা একটি তাত্ত্বিক ধারণার মাধ্যমে নিশ্চিত হয় না। প্রয়োজন কার্যকর নীতি, জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান, জনগণের অংশগ্রহণ এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় ধারাবাহিক উদ্যোগ। অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের চিন্তা এসব মৌলিক প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা ও বিতর্কের একটি বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষেত্র তৈরি করে।

অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের রাজনৈতিক চিন্তা ও দর্শনকে সাংগঠনিক পর্যায়ে এগিয়ে নেওয়ার একটি উদ্যোগ হলো বাংলাদেশ গণমুক্তি পার্টি (বিজিপি)। লেখকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তাঁর প্রণীত ২৮ দফার ভিত্তিতে ২০২৩ সালের ২৫ আগস্ট ঢাকার জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে দলটি আত্মপ্রকাশ করে। একই বছরের ৬ অক্টোবর একই স্থানে ২৮ দফাকে সর্বজনীন গণতন্ত্রের দর্শন হিসেবে উপস্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এই রাজনৈতিক উদ্যোগের লক্ষ্য হিসেবে সাধারণ মানুষের মুক্তি, অধিকার প্রতিষ্ঠা, বৈষম্য হ্রাস এবং সর্বজনীন কল্যাণের ধারণাকে সামনে রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশ গণমুক্তি পার্টি তাঁর চিন্তা ও দর্শন, বিশেষ করে ২৮ দফা এবং সর্বজনীন গণতন্ত্রের ধারণা দেশের ৬৮ হাজার গ্রামের মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে কাজ করছে বলে দলটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও এসব চিন্তা ও দর্শন নিয়ে আলোচনা ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে। তবে কোনো রাজনৈতিক দর্শনের গ্রহণযোগ্যতা ও কার্যকারিতা নির্ধারিত হয় শুধু তার প্রচারের মাধ্যমে নয়; এর নীতিগত ভিত্তি, বাস্তবায়নযোগ্যতা, জনসম্পৃক্ততা এবং মানুষের জীবনে তার প্রভাবের বিচারও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের চিন্তার যথার্থ মূল্যায়নের জন্য তাঁর রচনাবলি পাঠ, রাজনৈতিক দর্শনের বিশ্লেষণ এবং তাঁর প্রস্তাবিত ধারণাগুলো নিয়ে মুক্ত ও যুক্তিনির্ভর আলোচনা প্রয়োজন। তাঁর চিন্তার সঙ্গে একমত হওয়া কিংবা ভিন্নমত পোষণ করা—উভয় ক্ষেত্রেই যুক্তি, তথ্য ও বুদ্ধিবৃত্তিক সততা বজায় রাখা জরুরি। কারণ, স্বাধীন চিন্তা ও প্রশ্ন করার অধিকারই একটি প্রাণবন্ত গণতান্ত্রিক সমাজের অন্যতম ভিত্তি।
আজকের তরুণ প্রজন্মের সামনে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো গণতন্ত্রকে কেবল ক্ষমতার পালাবদলের ব্যবস্থায় সীমাবদ্ধ না রেখে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে যুক্ত করা। এমন একটি সমাজ নির্মাণের জন্য কাজ করা, যেখানে কৃষক তাঁর উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য পাবেন, শ্রমিক তাঁর শ্রমের মর্যাদা ও ন্যায্য পারিশ্রমিক পাবেন, বেকার যুবকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং প্রতিটি নাগরিক বৈষম্যহীনভাবে ন্যায়বিচার ও মৌলিক অধিকার লাভ করবেন।
একই সঙ্গে রাষ্ট্র পরিচালনায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, আইনের শাসন এবং জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা অপরিহার্য। গণতন্ত্রের সাফল্য শুধু রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের কাঠামোর ওপর নির্ভর করে না; এর সাফল্য নির্ভর করে রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা ন্যায়সংগতভাবে কাজ করছে এবং সাধারণ মানুষ কতটা নিরাপত্তা, মর্যাদা ও অধিকার ভোগ করতে পারছেন, তার ওপরও।
অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক ২০২৬ সালের ৫ জুলাই মৃত্যুবরণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত এই অধ্যাপকের মৃত্যুতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ শোক প্রকাশ করে তাঁকে নিষ্ঠাবান শিক্ষক, প্রখ্যাত প্রাবন্ধিক, লেখক ও গবেষক হিসেবে স্মরণ করেছে।  তাঁর দীর্ঘ শিক্ষকতা, সাহিত্যচর্চা, গবেষণা ও রাষ্ট্রচিন্তার মধ্য দিয়ে যে বুদ্ধিবৃত্তিক উত্তরাধিকার গড়ে উঠেছে, তা পাঠ, আলোচনা ও সমালোচনার মধ্য দিয়ে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া এখন গুরুত্বপূর্ণ কাজ।
৩০ সেপ্টেম্বর তাঁর জন্মদিনে তাঁকে স্মরণ করার অর্থ শুধু ব্যক্তিগত শ্রদ্ধা নিবেদন নয়; বরং তাঁর জীবনব্যাপী চিন্তা, প্রশ্ন ও সমাজভাবনাকে নতুন করে অনুধাবন করা। একজন চিন্তাবিদের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা প্রকাশ পায় তাঁর রচনা পাঠে, তাঁর ধারণার যুক্তিনির্ভর মূল্যায়নে এবং সমাজের গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাগুলো নিয়ে গভীরভাবে ভাবার মধ্য দিয়ে।
অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের জীবন ও কর্ম আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষের মুক্তি, মর্যাদা ও অধিকারকে উপেক্ষা করে কোনো রাজনৈতিক দর্শনই তার বৃহত্তর মানবিক লক্ষ্য পূরণ করতে পারে না। রাষ্ট্র ও রাজনীতির চূড়ান্ত সাফল্য বিচার করতে হয় মানুষের জীবনে তার বাস্তব প্রভাব দিয়ে।
তাঁর জন্মদিনে এই বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, প্রাবন্ধিক, গবেষক ও রাষ্ট্রচিন্তকের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই। মানুষের অধিকার, ন্যায়বিচার, গণতন্ত্র ও সর্বজনীন কল্যাণ নিয়ে তাঁর রেখে যাওয়া চিন্তা নতুন প্রজন্মকে জ্ঞানচর্চা, যুক্তিবাদী মনন এবং মানবিক সমাজ নির্মাণের আলোচনায় অনুপ্রাণিত করুক।


লেখক: এম এ আলীম সরকার, প্রাবন্ধিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, সভাপতি, বাংলাদেশ গণমুক্তি পার্টি (বিজিপি)।