Logo

ইউএসএ নিউজ    >>   নিউইয়র্কে স্বজন-শুভানুধ্যায়ীদের ভালোবাসায় সিক্ত জিউকের প্রতিষ্ঠাতা আব্দুস সালাম: গাইবান্ধার চার দশকের উন্নয়নযাত্রার গল্পে মুখর জ্যাকসন হাইটসের আড্ডা

নিউইয়র্কে স্বজন-শুভানুধ্যায়ীদের ভালোবাসায় সিক্ত জিউকের প্রতিষ্ঠাতা আব্দুস সালাম: গাইবান্ধার চার দশকের উন্নয়নযাত্রার গল্পে মুখর জ্যাকসন হাইটসের আড্ডা

নিউইয়র্কে স্বজন-শুভানুধ্যায়ীদের ভালোবাসায় সিক্ত জিউকের প্রতিষ্ঠাতা আব্দুস সালাম: গাইবান্ধার চার দশকের উন্নয়নযাত্রার গল্পে মুখর জ্যাকসন হাইটসের আড্ডা

প্রজ্ঞা নিউজ ডেস্ক :

রাত যত বাড়ছিল, আড্ডা ততই জমে উঠছিল। একজনের স্মৃতিচারণ শেষ হতে না হতেই আরেকজন ফিরে যাচ্ছিলেন গাইবান্ধায়—গণউন্নয়ন কেন্দ্রের (জিউকে) কার্যালয়ে কাটানো সময়, সেখানকার মানুষের আন্তরিকতা আর আতিথেয়তার স্মৃতিতে। নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটসের সানাই রেস্টুরেন্টে বসেও কথায় কথায় ফিরে আসছিল বাংলাদেশের উত্তরের জনপদ গাইবান্ধা।

এই আড্ডার মধ্যমণি ছিলেন গাইবান্ধাভিত্তিক বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা গণউন্নয়ন কেন্দ্র (জিউকে)-এর প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী প্রধান এম. আব্দুস সালাম। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র সফরে আসা আব্দুস সালাম ৫ অক্টোবর ২০২৬, সোমবার স্বপরিবারে নিউইয়র্কে পৌঁছান। তাঁর আগমন উপলক্ষে সন্ধ্যায় তাঁকে ঘিরে একত্র হন স্বজন, বন্ধু, শুভানুধ্যায়ী, সাংবাদিক ও সংস্কৃতিকর্মীরা।

আড্ডায় উপস্থিত ছিলেন এম. আব্দুস সালামের সহধর্মিণী, জিউকের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও বিশিষ্ট সমাজসেবিকা শামীমা মাহমুদা ইয়াসমিন এবং তাঁদের ছেলে, জিউকের অন্যতম পরিচালক আবু সায়েম মো. জান্নাতুল নূর রিশাত।

আড্ডার আয়োজক অনলাইন সংবাদ পোর্টাল ‘সন্ধান’-এর সম্পাদক ও গাইবান্ধা জেলার কৃতি সন্তান সনজীবন কুমার সরকার ও তাঁর সহধর্মিণী প্রতিমা সরকার, ঠিকানার বার্তা সম্পাদক শহীদুল ইসলাম, এটিএন বাংলা ও এটিএন নিউজের যুক্তরাষ্ট্রের বার্তা সম্পাদক কানু দত্ত, প্রজ্ঞা নিউজের সম্পাদক ও প্রকাশক উত্তম কুমার সাহা, সংস্কৃতিকর্মী দিলীপ মোদক, নিগার নাঈম তমা, লিনা আহমেদ, বঙ্কীম সাহা, রানা আহমেদসহ আরও অনেকে এতে অংশ নেন।

দেখা হওয়ার আনন্দে শুরু হওয়া আড্ডা একসময় পরিণত হয় স্মৃতিচারণ ও পুরোনো দিনের গল্পে। যারা আগে গাইবান্ধায় জিউকের কার্যক্রম পরিদর্শন করেছেন, তাঁদের স্মৃতিতে প্রতিষ্ঠানটির উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি বারবার উঠে আসে সেখানকার মানুষের আন্তরিকতা ও আতিথেয়তার কথা। দূরদেশের নিউইয়র্কে বসেও যেন সবাই ফিরে যান গাইবান্ধার সেই পরিচিত পরিবেশে।

এম. আব্দুস সালামও সবাইকে গাইবান্ধায় জিউকের কার্যক্রম পরিদর্শনের আমন্ত্রণ জানান। তিনি বলেন, প্রবাস থেকে কেউ জিউকে ভ্রমণে গেলে তিনি আনন্দিত হন। নিউইয়র্কে পরিচিতজনদের কাছে পেয়ে নিজের ভালো লাগার কথাও জানান তিনি। তাঁর ভাষায়, নিউইয়র্কে বেড়াতে এসে পরিচিত সবার সঙ্গে দেখা হলে খুব ভালো লাগে।

এম. আব্দুস সালামের জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে গণউন্নয়ন কেন্দ্রের চার দশকের পথচলা। ১৯৮৫ সালে গাইবান্ধায় প্রতিষ্ঠিত সংস্থাটি প্রান্তিক, দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্য নিয়ে যাত্রা শুরু করে। দারিদ্র্য, বন্যা ও নদীভাঙনে বিপর্যস্ত জনপদে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ সময়ের সঙ্গে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিস্তৃত হয়েছে।

জিউকের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের ১৭টি জেলায় উন্নয়ন ও মানবিক সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা করছে সংস্থাটি। নারী ও শিশুদের উন্নয়নকে বিশেষ অগ্রাধিকার দিয়ে শিক্ষা, জীবিকার সুযোগ সৃষ্টি, দক্ষতা উন্নয়ন, নারীর ক্ষমতায়ন, দুর্যোগ মোকাবিলা, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর সহায়তা এবং সামাজিক উন্নয়নের বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে প্রতিষ্ঠানটি।

জিউকের এই দীর্ঘ পথচলার পেছনে আব্দুস সালামের ব্যক্তিগত জীবনসংগ্রামেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। শৈশবে পরিবারের আর্থিক সংকট এবং মায়ের কঠোর পরিশ্রম তাঁকে দরিদ্র মানুষের জীবন ও সমস্যার সঙ্গে পরিচিত করে। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য কাজ করার আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয় তাঁর মধ্যে। শুরুর দিকে সহধর্মিণীর সহযোগিতা এবং নিজের চাকরির আয় দিয়ে সংস্থার কার্যক্রম এগিয়ে নেন তিনি।

১৯৮৭ সালের ভয়াবহ বন্যার সময় ত্রাণ ও মানবিক সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা জিউকের বিকাশে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক হয়ে ওঠে। পরবর্তীতে মানুষের তাৎক্ষণিক সহায়তার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন, আত্মনির্ভরতা ও মানবসম্পদ তৈরির ওপর গুরুত্ব বাড়ানো হয়।

জিউকের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, অতিদরিদ্র পরিবারের ৩২ হাজারের বেশি নারী-পুরুষকে দক্ষতা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। প্রত্যন্ত চরাঞ্চলে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, ঝরে পড়া শিশুদের জন্য উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা এবং প্রতিবন্ধী শিশুদের শিক্ষায় অন্তর্ভুক্তির উদ্যোগও প্রতিষ্ঠানটির দীর্ঘদিনের কার্যক্রমের অংশ।

শিক্ষা কার্যক্রমের নতুন সংযোজন জিইউকে রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ। গাইবান্ধা শহরসংলগ্ন নশরৎপুরে প্রায় ২০ বিঘা জায়গাজুড়ে প্রতিষ্ঠিত এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয় ২০২৪ সালের ৯ নভেম্বর। উদ্বোধন করেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান।

২০২৫ সালে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়। আবাসিক সুবিধা ও খেলার মাঠের পাশাপাশি এখানে বিজ্ঞান, ভাষা, বিতর্ক, সাংস্কৃতিক চর্চা ও রোবটিকসের সুযোগ রাখা হয়েছে। প্রচলিত পাঠ্যক্রমের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা, যোগাযোগ দক্ষতা, নেতৃত্বের গুণাবলি এবং দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

আব্দুস সালামের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আয় এর নিজস্ব উন্নয়ন এবং জিউকের অন্যান্য শিক্ষা কার্যক্রমে ব্যয় করার লক্ষ্য রয়েছে। এর মাধ্যমে একটি টেকসই শিক্ষা ও উন্নয়ন মডেল গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

নিউইয়র্কের এই আড্ডায় আব্দুস সালামের উপস্থিতি তাই শুধু পুরোনো পরিচিতজনদের সঙ্গে দেখা হওয়ার ঘটনা ছিল না। এর মধ্য দিয়ে গাইবান্ধার মাটি, মানুষের জীবনসংগ্রাম এবং চার দশকের উন্নয়নযাত্রার সঙ্গে প্রবাসী বাংলাদেশিদের আবেগ ও সম্পর্কের একটি সুন্দর সেতুবন্ধনও তৈরি হয়।

স্বজন ও শুভানুধ্যায়ীদের সঙ্গে দীর্ঘ সময়ের এই মিলনমেলায় উঠে আসে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, সামাজিক দায়বদ্ধতা, মানুষের জন্য কাজ করার অনুপ্রেরণা এবং দেশের প্রতি গভীর টান। কাজের পরিচয়ের পাশাপাশি উঠে আসে মানুষ আব্দুস সালামের সরলতা, আন্তরিকতা এবং পুরোনো সম্পর্ক ধরে রাখার মানসিকতা।

রাত বাড়ছিল, কিন্তু আড্ডা যেন শেষ হচ্ছিল না। গাইবান্ধার স্মৃতি নিয়ে শুরু হওয়া কথোপকথনে যোগ হলো নিউইয়র্কের আরেকটি সন্ধ্যার স্মৃতি। বিদায়ের আগে রইল আব্দুস সালামের আন্তরিক আমন্ত্রণ—দেশে গেলে জিউকে আসবেন, প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম দেখবেন এবং গাইবান্ধার মানুষের আতিথেয়তা গ্রহণ করবেন।

নিউইয়র্কের ব্যস্ত নগরজীবনের এক সন্ধ্যায় তাই স্বজন-শুভানুধ্যায়ীদের ভালোবাসায় গাইবান্ধা যেন আবারও ফিরে এলো সবার আড্ডায়।