Logo

অপরাধ    >>   যৌন নিপীড়নের গুরুতর অভিযোগে নিউইয়র্কে বাংলাদেশি চিকিৎসক গ্রেপ্তার, ১৫ বছরের কিশোরীসহ দুই রোগীকে স্পর্শের অভিযোগ

যৌন নিপীড়নের গুরুতর অভিযোগে নিউইয়র্কে বাংলাদেশি চিকিৎসক গ্রেপ্তার, ১৫ বছরের কিশোরীসহ দুই রোগীকে স্পর্শের অভিযোগ

যৌন নিপীড়নের গুরুতর অভিযোগে নিউইয়র্কে বাংলাদেশি চিকিৎসক গ্রেপ্তার, ১৫ বছরের কিশোরীসহ দুই রোগীকে স্পর্শের অভিযোগ

প্রজ্ঞা নিউজ ডেস্ক, নিউইয়র্ক:

নিউইয়র্কের কুইন্সে যৌন নিপীড়নের গুরুতর অভিযোগে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ৭২ বছর বয়সী শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. ফজলুল ইউসুফকে গ্রেপ্তার করেছে নিউইয়র্ক পুলিশ বিভাগ। অভিযোগ অনুযায়ী, ফ্লাশিংয়ে তাঁর পরিচালিত চিকিৎসাকেন্দ্রে দুই নারী রোগীর সঙ্গে পৃথক দুটি ঘটনায় তাঁদের সম্মতি ছাড়া শরীরের স্পর্শকাতর অংশে হাত দেওয়া হয়। অভিযোগকারীদের একজন ২০ বছর বয়সী তরুণী, অন্যজন ১৫ বছর বয়সী কিশোরী। তবে এসব অভিযোগ এখনো আদালতে প্রমাণিত হয়নি। আদালতে ডা. ইউসুফ নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত ২০ অক্টোবর ২০২৬ মঙ্গলবার বিকেলে ফ্লাশিংয়ের ৫৭-০৭, ১৪৬ নম্বর স্ট্রিটে অবস্থিত চিকিৎসাকেন্দ্রে ঘটনাগুলো ঘটে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। নিউইয়র্ক পুলিশের বিশেষ ভিকটিমস স্কোয়াড গত ২৭ অক্টোবর মঙ্গলবার সকালে তাঁকে গ্রেপ্তার করে। পরে তাঁকে কুইন্সের ফৌজদারি আদালতে হাজির করা হয়।

আদালতে দাখিল করা অভিযোগপত্র অনুযায়ী, প্রথম ঘটনায় ২০ বছর বয়সী এক নারী রোগীর পোশাকের ভেতরে হাত ঢুকিয়ে তাঁর স্তনে স্পর্শ করার অভিযোগ আনা হয়েছে ডা. ইউসুফের বিরুদ্ধে। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ওই তরুণীকে সুন্দরী আখ্যা দিয়ে নিজের ক্লিনিকে কাজ করার প্রস্তাব দেন তিনি।

একই দিন বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে ১৫ বছর বয়সী আরেক রোগীর সঙ্গে অনুরূপ ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগপত্র অনুযায়ী, ওই কিশোরীর উরুতে এবং পোশাকের ওপর দিয়ে স্তনে স্পর্শ করেন চিকিৎসক। তাঁকেও সুন্দরী বলে নিজের ক্লিনিকে কাজ করার প্রস্তাব দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

দুই রোগীর অভিযোগে একই ধরনের মন্তব্য ও আচরণের বিবরণ উঠে এসেছে। তবে অভিযোগপত্রে উল্লিখিত ঘটনাগুলোর সত্যতা বিচারিক প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হবে।

ডা. ইউসুফের বিরুদ্ধে জোরপূর্বক স্পর্শের দুটি অভিযোগ, কিশোরীর মানসিক ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি করতে পারে এমন আচরণের একটি অভিযোগ, তৃতীয় মাত্রার যৌন নিপীড়নের দুটি অভিযোগ এবং দ্বিতীয় মাত্রার হয়রানির দুটি অভিযোগ আনা হয়েছে বলে প্রাপ্ত তথ্যে উল্লেখ রয়েছে।

আদালতে হাজিরার পর বিচারক ইন্দিরা খান নগদ ১০ হাজার মার্কিন ডলার অথবা নির্ধারিত শর্তে ৩০ হাজার ডলারের বন্ডের মাধ্যমে জামিনের শর্ত নির্ধারণ করেন। একই সঙ্গে আদালত একটি অস্থায়ী সুরক্ষা আদেশও জারি করেন।

ডা. ফজলুল ইউসুফের পেশাগত পরিচয় সম্পর্কে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চিকিৎসকদের তথ্যভান্ডার ওয়েবএমডিতে তাঁর নাম ডা. ফজলুল এইচ ইউসুফ হিসেবে উল্লেখ রয়েছে। সেখানে তাঁর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের নাম পাওয়া যায়।

বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন অব নর্থ আমেরিকা বা বিএমএএনএ-এর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সাবেক নির্বাহী কমিটির তালিকাতেও নিউইয়র্কের ডা. ফজলুল এইচ ইউসুফের নাম রয়েছে। সংগঠনটির প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, তিনি ২০১৩ থেকে ২০১৫ মেয়াদে কোষাধ্যক্ষ এবং ২০১৯ থেকে ২০২১ মেয়াদে সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে রোগীদের যৌন নিপীড়নের অভিযোগ নিয়ে অতীতেও সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। নজরুল মিন্টুর ফেসবুক পোস্টে উল্লেখ করা হয়েছে, নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটসে কর্মরত চিকিৎসক ডা. ফেরদৌস খন্দকারের বিরুদ্ধেও কয়েকজন নারী রোগী দেওয়ানি মামলা করেছিলেন। ২০২১ সালে প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে পাঁচ নারীর মামলার কথা উঠে আসে। অভিযোগগুলোর মধ্যে চিকিৎসার প্রয়োজন ছাড়া স্তন পরীক্ষা এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক রোগীদের অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে স্পর্শ করার বিষয়ও ছিল। এগুলো সংশ্লিষ্ট মামলায় উত্থাপিত অভিযোগ; সেগুলোকে প্রমাণিত অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, নিউইয়র্কের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ পরবর্তী সময়ে ডা. ফেরদৌস খন্দকারের চিকিৎসা করার অনুমতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়। ২০২৪ সালের ১৫ অক্টোবরের পর নিউইয়র্কে তাঁর চিকিৎসা করার সুযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ার তথ্য সরকারি নথির বরাতে প্রকাশিত হয়েছে। 

এ ছাড়া এফবিআইয়ের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, জাহিদুল ইসলাম নামের এক বাংলাদেশি চিকিৎসকের বিরুদ্ধে পেনসিলভানিয়ার ফিলাডেলফিয়ায় ১৯৯৬ সালে এক নারী রোগীকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগে তদন্ত ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানার তথ্য রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, অস্ত্রোপচারের পর হাসপাতালে থাকা ওই রোগীকে ওষুধের প্রভাবে আচ্ছন্ন অবস্থায় নির্যাতন করা হয়েছিল। এ ঘটনাটি সম্পূর্ণ পৃথক একটি মামলা এবং এর সঙ্গে ডা. ফজলুল ইউসুফের মামলার কোনো যোগসূত্র প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

চিকিৎসা নিতে গিয়ে একজন রোগী নিজের শারীরিক অসুস্থতা, ব্যক্তিগত তথ্য এবং শরীরের সংবেদনশীল বিষয় চিকিৎসকের কাছে তুলে ধরেন। এ সম্পর্কের ভিত্তি পারস্পরিক আস্থা, পেশাগত নৈতিকতা এবং রোগীর সম্মতি। বিশেষ করে শিশু ও কিশোর রোগীদের চিকিৎসার ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও সুরক্ষার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

চিকিৎসাকেন্দ্রে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ বা অসদাচরণের অভিযোগ উঠলে তা যথাযথভাবে তদন্ত করা, অভিযোগকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে তদন্ত ও বিচার শেষ হওয়ার আগে অভিযুক্তকে দোষী সাব্যস্ত করে উপস্থাপন করাও সমীচীন নয়।

নিউইয়র্ক পুলিশের বিশেষ ভিকটিমস স্কোয়াড ডা. ইউসুফের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে। একই চিকিৎসকের কাছে অন্য কেউ নিপীড়নের শিকার হয়ে থাকলে পুলিশকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করার আহ্বান জানানো হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।

ঘটনাটি প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটিতে চিকিৎসাসেবার নিরাপত্তা, পেশাগত জবাবদিহি এবং রোগীদের অধিকার নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে। এখন তদন্তের ফলাফল, আদালতের পরবর্তী কার্যক্রম এবং অভিযোগগুলোর বিচারিক নিষ্পত্তির দিকে নজর থাকবে।

তথ্যসূত্র: সন্ধান২৪.কম, নজরুল মিন্টু ও হাবিব রহমানের ফেসবুক পোস্ট, ABC7NY, New York Post এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি ও পেশাগত তথ্যভান্ডার।