Logo

আন্তর্জাতিক    >>   নিষেধাজ্ঞা ও নৌ অবরোধের মধ্যেও ইরানের ২৫ হাজার কোটি টাকার সামরিক সরঞ্জাম আমদানি

নিষেধাজ্ঞা ও নৌ অবরোধের মধ্যেও ইরানের ২৫ হাজার কোটি টাকার সামরিক সরঞ্জাম আমদানি

নিষেধাজ্ঞা ও নৌ অবরোধের মধ্যেও ইরানের ২৫ হাজার কোটি টাকার সামরিক সরঞ্জাম আমদানি

প্রজ্ঞা নিউজ ডেস্ক:

যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ ও পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহ অব্যাহত রেখেছে ইরান। বিদেশি কোম্পানি, মধ্যস্থতাকারী ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আড়ালে গড়ে তোলা একটি গোপন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে দেশটি সামরিক সরঞ্জাম, বিস্ফোরক ও ভারী যানবাহন আমদানি করছে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) প্রকাশিত এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাঁচ হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে অন্তত ২০০ কোটি ডলার (প্রায় ২৪ হাজার ৮০০ কোটি টাকা) মূল্যের সামরিক সরঞ্জাম আমদানি করেছে ইরান।

প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর শুরু হওয়া যুদ্ধে ইরান হাজার হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করেছে। এত বিপুল অস্ত্র ব্যবহারের পরও কীভাবে দেশটি নিজেদের অস্ত্রভাণ্ডার পুনরায় পূরণ করছে, তা অনুসন্ধান করেছে রয়টার্স।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ইরানের সামরিক সরঞ্জাম আমদানির সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর নামের শুরুতে রয়েছে ‘এমওডি’। এসব প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা হিসেবে তেহরানে দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ঠিকানা ব্যবহার করা হয়েছে। নথিতে প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিষ্ঠার তারিখ দেখানো হয়েছে ১৯৭৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি। তবে করপোরেট নথি অনুযায়ী, অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানই প্রকৃতপক্ষে ২০১৩ সালে গড়ে উঠেছে।

এই নেটওয়ার্কের সঙ্গে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এবং দেশটির প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রণাধীন ব্যবসায়িক গোষ্ঠী বোনিয়াদের যোগসূত্র রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিদেশি ভুয়া কোম্পানি ও মধ্যস্থতাকারীদের ব্যবহার করে তেল বিক্রির অর্থ সামরিক সরঞ্জাম কেনায় ব্যয় করা হচ্ছে।

রয়টার্সের পর্যালোচনা করা চালানের ৯৭ শতাংশের মূল্য পরিশোধে সরাসরি মুদ্রা লেনদেনের প্রয়োজন হয়নি। অর্থাৎ, আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তর ছাড়াই এসব লেনদেন সম্পন্ন হয়েছে। এতে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার নজরদারি এড়িয়ে আমদানি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া সহজ হয়েছে।

সবচেয়ে বড় আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান

এই নেটওয়ার্কের এমওডি ৩৪৬৪২৮ (MOD 346428) নামের একটি প্রতিষ্ঠান সবচেয়ে বেশি সামরিক সরঞ্জাম আমদানি করেছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি ২৩০ কোটি ডলার (প্রায় ২৮ হাজার ৫২০ কোটি টাকা) মূল্যের সরঞ্জাম কিনেছে। এর মধ্যে রয়েছে রকেটের জ্বালানি তৈরির উপাদান, বিস্ফোরক ও অস্ত্রের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ।

২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিলের মধ্যে চীন থেকে ৮৮৬ টন রাসায়নিক পদার্থ আমদানি করে প্রতিষ্ঠানটি। এসবের মধ্যে ছিল সোডিয়াম ক্লোরেট ও পারক্লোরেট, যা কঠিন জ্বালানিচালিত রকেট তৈরির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

রয়টার্সের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এসব রাসায়নিকের একটি চালান পৌঁছানোর তিন দিন পর, ২০২৫ সালের ২৬ এপ্রিল ইরানের শহীদ রাজায়ি বন্দরে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে। এতে অন্তত ৭০ জন নিহত এবং ১ হাজার ২০০ জনের বেশি আহত হন। সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, বন্দরে রাখা কনটেইনারে সোডিয়াম পারক্লোরেট জ্বলে ওঠার কারণে বিস্ফোরণটি ঘটেছিল।

সামরিক কাজে ব্যবহারযোগ্য ট্রাক আমদানি

একই প্রতিষ্ঠান ৪৩৫টি আইভেকো ট্রাক আমদানি করেছে। এ ধরনের ভারী ট্রাককে সামরিক বাহিনী ছদ্মবেশী ভ্রাম্যমাণ ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণযান হিসেবে ব্যবহার করতে পারে।

এ ছাড়া হাজার হাজার টয়োটা হাইলাক্স ও ল্যান্ড ক্রুজার পিকআপ আমদানি করেছে ইরান। এসব গাড়ির পেছনে ভারী মেশিনগান বসিয়ে আইআরজিসি সামরিক কাজে ব্যবহার করে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

যুদ্ধের মধ্যেও অব্যাহত আমদানি

রয়টার্সের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, যুদ্ধ শুরুর পরও ইরানে সামরিক সরঞ্জাম আমদানি বন্ধ হয়নি। চীন থেকে টাইটানিয়াম, নাইট্রোসেলুলোজ ও বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ আমদানি করেছে দেশটি। এসব উপাদান ক্ষেপণাস্ত্রের কাঠামো, রকেটের জ্বালানি ও বিস্ফোরক তৈরিতে ব্যবহার করা যায়।

অন্যদিকে, রাশিয়া থেকে পাঁচটি চালানে মোট ৭৬ লাখ ডলারের (প্রায় ৯৪ কোটি ২৪ লাখ টাকা) বিস্ফোরক সক্রিয় করার যন্ত্র আমদানি করেছে ইরান। সর্বশেষ চালানটি পৌঁছেছে ২০২৬ সালের জুনে।

এ ছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকেও ২ কোটি ৭০ লাখ ডলারের (প্রায় ৩৩৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা) পণ্য আমদানি করেছে দেশটি। পাশাপাশি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের কাঠামো তৈরিতে ব্যবহারযোগ্য আধুনিক যন্ত্রপাতিও সংগ্রহ করেছে ইরান।

রয়টার্সের এই অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ও যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধের মধ্যেও বিদেশি সরবরাহকারী, মধ্যস্থতাকারী এবং জটিল আর্থিক ব্যবস্থার মাধ্যমে ইরানের সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। সূত্র: রয়টার্স, জাগোনিউজ