নেপালের প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলির পদত্যাগ: দেশত্যাগ ঠেকাতে নেপাল-ভারত সীমান্তে কড়া নজরদারি
প্রজ্ঞা নিউজ ডেস্ক:
নেপালের প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি বিক্ষোভ-সংঘাতের জেরে পদত্যাগ করেছেন। এর আগে বিক্ষোভকারীরা তার ব্যক্তিগত বাসভবনে অগ্নিসংযোগ করেন। আজ মঙ্গলবার (৯ সেপ্টেম্বর) প্রধানমন্ত্রী ওলি স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বর্তমান সংকটের সাংবিধানিক সমাধানের পথ প্রশস্ত করার জন্য তিনি পদত্যাগ করেছেন।
দুর্নীতি এবং সামাজিক মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিরুদ্ধে গতকাল সোমবার (৮ সেপ্টেম্বর) থেকে বিক্ষোভ-সংঘাতে উত্তাল হয়ে ওঠে নেপাল। সোমবার নিরাপত্তা বাহিনীর দমন-পীড়নে ১৯ তরুণ বিক্ষোভকারী নিহত হওয়ার ঘটনায় দেশজুড়ে ক্ষোভ আরও ছড়িয়ে পড়ে। সরকার শক্ত হাতে বিক্ষোভ দমনের চেষ্টা করলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
মঙ্গলবার সকাল থেকেই বিক্ষোভকারীরা বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতার বাড়ি ও প্রধান দলগুলোর কার্যালয়ে হামলা চালায়। বিভিন্ন স্থানে পাথর নিক্ষেপ ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।
মঙ্গলবার ললিতপুরে অবস্থিত দেশটির তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তিমন্ত্রী পৃথ্বী সুব্বা গুরুঙের বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয় বিক্ষোভকারীরা। ভাসেপাটিতে অবস্থিত উপ-প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রী বিষ্ণু পাউডেলের বাড়িতেও ইটপাটকেল নিক্ষেপ করা হয়। সোমবার পদত্যাগ করা সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রমেশ লেখকের বাসভবনেও হামলা চালানো হয়।
বিক্ষোভকারীরা সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও নেপালি কংগ্রেস সভাপতি শেরবাহাদুর দেউবার বুদ্বানিলকণ্টায় অবস্থিত বাড়িতেও হামলার চেষ্টা করে, তবে হামলার আগেই তাদের প্রতিহত করা হয়। খুমলটারে অবস্থিত প্রধান বিরোধী দল সিপিএনের (মাওইস্ট সেন্টার) চেয়ারম্যান পুষ্পকমল দাহালের বাসভবনেও ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেছে বিক্ষোভকারীরা।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রশাসনের বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের পরেও বিভিন্ন জেলায় মুখ্যমন্ত্রী, প্রাদেশিক মন্ত্রী ও অন্য নেতাদের বাড়ি-ঘরেও হামলা চালিয়েছে বিক্ষোভকারীরা।
নেপালে টানা সহিংস বিক্ষোভে অন্তত ১৯ জন নিহত হওয়ার পর যখন প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি পদত্যাগ করেছেন তার পর পরই জোরালো হয়েছে গুঞ্জন- তিনি দেশ ছেড়ে পালাতে পারেন। এই আশঙ্কায় নেপাল ও ভারত দুই দেশই সীমান্ত এবং আকাশপথে কঠোর নজরদারি শুরু করেছে।
ওলির পদত্যাগের পর রাজধানী কাঠমান্ডুসহ বিভিন্ন শহরে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও কারফিউ অমান্য করে বিক্ষোভকারীদের রাস্তায় নামার ঘটনায় প্রশাসন হিমশিম খাচ্ছে। এই অবস্থায় সদ্য সাবেক প্রধানমন্ত্রীর দেশত্যাগ ঠেকাতে ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সব ধরনের উড্ডয়ন ও অবতরণ বাতিল করা হয়েছে। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, বিশেষ অনুমতি ছাড়া কোনো আন্তর্জাতিক বা অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট ছাড়তে দেওয়া হবে না। ফলে আকাশপথে ওলি দেশ ছাড়ার সুযোগ কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে।
প্রতিবেশী ভারতও সীমান্তে নজরদারি জোরদার করেছে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের পানিটাঙ্কি সীমান্তে বাড়তি পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। বসানো হয়েছে অতিরিক্ত তল্লাশি চৌকি। সীমান্ত পারাপার, যানবাহন ও যাত্রীদের চলাচল নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে জানিয়েছে, সীমান্ত এলাকায় এখন কার্যত উচ্চ সতর্কতা জারি রয়েছে, যাতে কোনোভাবেই ওলি গোপনে প্রবেশ করতে না পারেন।
যদিও মঙ্গলবার দুটি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট কাঠমান্ডু থেকে ছেড়েছে, তবে ওলির নাম যাত্রী তালিকায় ছিল কি না তা নিশ্চিত নয়। রাজনৈতিক মহলে ধারণা করা হচ্ছে, তিনি ভিন্ন পথে বা গোপন ব্যবস্থায় দেশ ছাড়ার চেষ্টা করতে পারেন। এই আশঙ্কায় সীমান্ত ও বিমানবন্দর উভয় জায়গাতেই নজরদারি সর্বোচ্চ পর্যায়ে রাখা হয়েছে।
নয়াদিল্লি জানিয়েছে, নেপালে প্রাণহানির ঘটনায় তারা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, নেপাল ভারতের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও প্রতিবেশী, তাই সব পক্ষের প্রতি সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানানো হচ্ছে। পাশাপাশি নেপালে অবস্থানরত ভারতীয় নাগরিকদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
সব মিলিয়ে, ওলি দেশ ছেড়ে পালাতে পারবেন কি না তা এখনো অনিশ্চিত। তবে নেপাল-ভারত উভয় দেশের কঠোর নজরদারি ও সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা তার সম্ভাব্য পালানোর পথ কার্যত রুদ্ধ করে দিয়েছে। সূত্র: দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া, বিবিসি, কাঠমান্ডু পোস্ট



















