Logo

আন্তর্জাতিক    >>   নির্বাচনের আগে গণভোট বাংলাদেশকে ইসলামিক রাষ্ট্রের পথে ঠেলে দিতে পারে: হাউস অব লর্ডসে বব ব্ল্যাকম্যান এমপির কঠোর সতর্কতা

নির্বাচনের আগে গণভোট বাংলাদেশকে ইসলামিক রাষ্ট্রের পথে ঠেলে দিতে পারে: হাউস অব লর্ডসে বব ব্ল্যাকম্যান এমপির কঠোর সতর্কতা

নির্বাচনের আগে গণভোট বাংলাদেশকে ইসলামিক রাষ্ট্রের পথে ঠেলে দিতে পারে: হাউস অব লর্ডসে বব ব্ল্যাকম্যান এমপির কঠোর সতর্কতা

প্রজ্ঞা নিউজ ডেস্ক । প্রেস রিলিজ | লন্ডন | ২৮ জানুয়ারি ২০২৬:
ব্রিটিশ সংসদের জ্যেষ্ঠ সদস্য ও কনজারভেটিভ পার্টির এমপি রবার্ট জন ব্ল্যাকম্যান সতর্ক করে বলেছেন, বাংলাদেশের সামনে বর্তমানে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণ উপস্থিত হয়েছে। নির্বাচনের আগে প্রস্তাবিত একটি গণভোট দেশটিকে কার্যত একটি ইসলামিক রাষ্ট্রে রূপান্তরের পথে নিয়ে যেতে পারে, যা বাংলাদেশের জনগণের প্রকৃত আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন নয়।
হাউস অব লর্ডসের কমিটি রুম–৩-এ অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের সেমিনার “বাংলাদেশ অ্যাট দ্য ক্রসরোডস”-এ অংশগ্রহণ করে তিনি এসব কথা বলেন। সেমিনারটির আয়োজন করেন লর্ড রামি রেঞ্জার। যৌথভাবে অনুষ্ঠানটি আয়োজন করে পলিটিকা নিউজ, সেন্টার ফর গ্লোবাল পলিসি অ্যান্ড গভর্ন্যান্স এবং নর্থ্যাম্পটন ব্রিটিশ বাংলাদেশি বিজনেস চেম্বার।
অনুষ্ঠানে আনুষ্ঠানিক স্বাগত বক্তব্য দেন নর্থ্যাম্পটন টাউন কাউন্সিলের কাউন্সিলর নাজ ইসলাম এবং সভাপতিত্ব করেন লর্ড রামি রেঞ্জার। সেমিনারের ক্রস-পার্টি আলোচনা ও প্রশ্নোত্তর পর্ব পরিচালনা করেন পলিটিকা নিউজের প্রধান সম্পাদক তানভীর আহমেদ। মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন সেন্টার ফর গ্লোবাল পলিসি অ্যান্ড গভর্ন্যান্স-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা ব্যারিস্টার সঞ্জয় কুমার রায়।
বব ব্ল্যাকম্যান বলেন, তিনি বহুবার বাংলাদেশ সফর করেছেন এবং যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বিদ্যমান। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ-এর নেতৃত্বে যুক্তরাজ্য বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে সমর্থন করেছিল—এমন এক সময়ে, যখন অনেক দেশ তা প্রতিহত করার চেষ্টা করছিল। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর প্রথম বিদেশ সফরে যুক্তরাজ্যে এসে প্রধানমন্ত্রী হিথের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন—যা দুই দেশের সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ভিত্তি।
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, শেখ হাসিনার শাসনামলে ছাত্র হত্যাকাণ্ড ও আন্দোলন ঘিরে গুরুতর উদ্বেগ থাকলেও, তাঁকে ক্ষমতা থেকে অপসারণের পর তাঁর অনুপস্থিতিতে ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড প্রদান এবং আওয়ামী লীগের অন্যান্য নেতাদের লক্ষ্যবস্তু করা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
তিনি বলেন, “বাংলাদেশ সফরের সময় আমি সব রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার চেষ্টা করেছি। আমরা সবার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক চাই এবং বাংলাদেশকে একটি স্থিতিশীল ও শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চাই। কিন্তু আগামী মাসে নির্ধারিত নির্বাচনকে বর্তমানে অবাধ, সুষ্ঠু ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বলা যায় না।” তিনি উল্লেখ করেন, জনমত জরিপ অনুযায়ী এখনো দেশের অন্তত ৩০ শতাংশ মানুষ আওয়ামী লীগকে সমর্থন করে।
বব ব্ল্যাকম্যান জোর দিয়ে বলেন, “আমি বাংলাদেশের কোনো রাজনৈতিক দলকে সমর্থন করি না। কিন্তু যদি কোনো রাজনৈতিক দলকে নির্বাচন থেকে নিষিদ্ধ করা হয়, তাহলে সেটি একটি গুরুতর গণতান্ত্রিক সমস্যা। অতীতে আমি বিএনপি নেতাদের নির্বাচন বর্জন না করার পরামর্শ দিয়েছিলাম। কারণ, অংশগ্রহণ না করলে জয়ের কোনো সুযোগ থাকে না। বর্জন গণতন্ত্রকে দুর্বল করে এবং প্রতিনিধিত্বহীনতা সৃষ্টি করে।”
গণভোট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “সংবিধান পরিবর্তনের প্রশ্নে গণভোট একটি দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় হতে পারে। কিন্তু নির্বাচনের আগে প্রস্তাবিত এই গণভোটের দিকনির্দেশনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এটি কার্যত বাংলাদেশকে একটি ইসলামিক রাষ্ট্রে রূপান্তরের দিকে নিয়ে যেতে পারে—যা আমি বিশ্বাস করি না যে বাংলাদেশের জনগণ চায়।”
তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, ভোটকেন্দ্রে ভয়ভীতি প্রদর্শন, সশস্ত্র ব্যক্তিদের উপস্থিতি এবং মানুষকে জোরপূর্বক ভোট দিতে বাধ্য করার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। “এটি কোনোভাবেই গণতন্ত্র নয়। এমন পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ চরম ঝুঁকির মুখে পড়বে,” বলেন তিনি।
পাকিস্তান প্রসঙ্গে মন্তব্য করতে গিয়ে বব ব্ল্যাকম্যান বলেন, কিছু মহল থেকে পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের পক্ষে বক্তব্য শোনা যাচ্ছে। “বাংলাদেশ পাকিস্তানের কাছ থেকে স্বাধীন হতে গিয়ে বিপুল রক্তক্ষয় করেছে। আমি বিশ্বাস করি না যে বাংলাদেশের জনগণ কোনোভাবেই পুনরায় এমন একটি রাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত হতে চায়, যেখানে সামরিক শাসন প্রভাবশালী এবং গণতন্ত্র কার্যত মৃত।”
বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি বলেন, হিন্দু, খ্রিস্টান এবং সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায় ধারাবাহিকভাবে টার্গেটের শিকার হচ্ছে। রাস্তায় মানুষ খুন হচ্ছে, উপাসনালয় পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, বাড়িঘর লুট করা হচ্ছে। “এগুলো কোনো গুজব নয়। নিহতদের নাম, পরিচয় ও ঘটনার প্রামাণ্য তথ্য আমাকে দেখানো হয়েছে। এগুলো বাস্তব হত্যাকাণ্ড,” বলেন তিনি।
প্রবাসী বাংলাদেশিদের উদ্দেশে বব ব্ল্যাকম্যান আহ্বান জানিয়ে বলেন, নিজ নিজ এলাকার এমপিদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বাংলাদেশের পরিস্থিতি তুলে ধরতে হবে। তিনি অভিযোগ করেন, ফরেন, কমনওয়েলথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিসের প্রতিক্রিয়া হতাশাজনক এবং তারা তত্ত্বাবধায়ক নেতৃত্বকে পর্যাপ্ত জবাবদিহি ছাড়াই চলতে দিতে সন্তুষ্ট বলে মনে হয়।
শেষে তিনি বলেন, “আমি কথা বলা অব্যাহত রাখব, আমরা অল্প কয়েকজন হলেও। গত সপ্তাহে বাংলাদেশ নিয়ে আমার একটি ভিডিও পাঁচ লক্ষাধিক মানুষ দেখেছে—এটি প্রমাণ করে যে আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের চলমান পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ রয়েছে। বাস্তবতা হলো—মানুষ তাদের পরিচয়, ধর্ম ও রাজনৈতিক বিশ্বাসের কারণে মারা যাচ্ছে। এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।”